আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস মহান মে দিবস; নগরিতে হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের বিক্ষোভ

১৪১-তম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস মহান মে দিবসে সকল হোটেল শ্রমিকদের খানাদানা বেতনসহ সর্বাত্মক ছুটি বাস্তবায়নের দাবিতে আজ (৩০ এপ্রিল) নগরিতে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করে সিলেট জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন।

সন্ধ্যা ৭টায় কোর্ট পয়েন্টে জমায়েত হয়ে এক বিক্ষোভ পশ্চিম জিন্দাবাজার, জামতালা, লামাবাজার, রিকাবীবাজার হয়ে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ১নং গেইটের সামনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ জেলা সভাপতি মো. ছাদেক মিয়ার সভাপতিত্বে এবং ক্রীড়া সম্পাদক সুনু মিয়ার সাগরের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সরকার, শাহপরান থানা কমিটির সভাপতি মো. খোকন আহমদ, সিলেট জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা কমিটির সভাপতি মো. মনির হোসেন, সহ-সভাপতি শাহীন আহমদ, জেলা কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইমান আলী, আম্বরখানা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি রাশেদ আহমদ ভূইয়া, বন্দরবাজার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি সাহাব উদ্দিন, চন্ডিপুল আঞ্চলিক কমিটির কমিটির সভাপতি মহিদুল ইসলামসহ প্রমুখ।

সমাবেশ থেকে মালিকদের হুশিয়ার করে বলেন প্রতি বছর আসলে মে দিবসের ছুটি নিয়ে টালবাহানা করা হয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অর্ধবেলা ছুটি প্রদান করা হয় কিন্তু ১মে ২৪ ঘণ্টা ছুটি ভোগ করা শ্রমিকদের আইনি প্রাপ্য অধিকার। প্রতিবছর শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে মালিক গোষ্টী নানা টালবাহানা করতে থাকেন। ১মে শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস। ১৮৮৬ সালের আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা যেমন তাদের অধিকারের জন্য জীবন দিতে পিছপা হয়নি ঠিক তেমনি বর্তমানে এসেও শ্রমিকরা তাদের অধিকার বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে রক্ত দিতে পিছপা হবেনা। নেতৃবৃন্দ মালিকদের মনে করিয়ে দেন ‘শ্রমিকদের হারানোর কিছু নেই কিন্তু জয় করার জন্য আছে সারা বিশ্ব’।
১মে সারাদিন হোটেল-রেস্টুরেন্ট সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকদের খানাদানা সর্বাত্মক ছুটি কার্যকরের দাবিতে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক, সিসিক প্রশাসক, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠার পরিদর্শন, মালিক সমিতি সহ সকল মালিকদের স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। শ্রমিকরা যাতে তাদের ন্যায়সংগত আইনি পাওনা ভোগ করতে পারে এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন পাশাপাশি মালিকদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকরা সারাবছর প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মুনাফা সৃষ্টি করে কিন্তু বছরে একদিন ছুটি ভোগ করা শ্রমিকদের যেমন আইনি অধিকার তদ্রুপ মানবিক ও বটে।
সভাপতি তার বক্তব্যে বলেন বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে ১মে শ্রমিক শ্রেণির জন্য এক ঐতিহাসিক ও গৌরবজনক অধ্যায়। শ্রমিকরা সারা বছর মালিকের প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মুনাফা তৈরি করলেও মে দিবস আসলে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার প্রদান করতে মালিকরা নানা টালবাহানা করে থাকেন। শ্রমিকদের যে বেতন দেওয়া হয় তা দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাসের অর্ধেক চলাও কষ্টসাধ্য। নি¤œতম মজরি ঘোষণার দাবিতে শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে গত ০৫ মে ২০২৫ হোটেল-রেস্টুরেন্ট শিল্প সেক্টরে সরকারের নি¤œতম মজুরি হার ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই নি¤œতম মজুরি বর্তমান বাজারদর এবং ৬ সদস্যদের একটি পরিবারের ভরণপোষণের প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের দাবি থেকে অনেক কম। কিন্তু তারপরও সরকার ঘোষিত নি¤œতম মজুরি ঘোষিত হওয়ার পর প্রায় এক বছর হতে চললেও তা সর্বস্তরে কার্যকর করা হয়নি। তদোপুরি হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের শ্রমআইনের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়। হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট শ্রমিকদের চাকুরির নিশ্চয়তা ও জীবনের নিরাপত্তা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ৫ ধারায় নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র, ৬ ধারায় সার্ভিস বই, ২(১০) ধারায় চাকুরীচ্যূতিজনিত ৪ মাসের নোটিশ পে, প্রতিবছর চাকুরীর জন্য ১ মাসের গ্রাচ্যুয়েটি, ১০৩ ধারায় সপ্তাহে দেড়দিন সাপ্তাহিক ছুটি, ১০৮ ধারায় দৈনিক ৮ ঘন্টা সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা কাজ, অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বিগুণ মজুরি প্রদান, ১১৫ ধারায় বছরে ১০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি, ১১৬ ধারায় ১৪ দিন অসুস্থতার ছুটি, ১১৭ ধারায় প্রতি ১৮ দিন কাজের জন্য ১ দিন অর্জিত ছুটি, ১১৮ ধারায় ১৩ দিন উৎসব ছুটি প্রদানের আইন থাকলেও শ্রমিকদেরকে এই সকল আইনগত অধিকার হতে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ হোটেল মালিকপক্ষ সরকারী আইনের তোয়াক্কা না করলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নির্বিকার। এমতাবস্থায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শ্রমমন্ত্রী জনাব আরিফুল হক চৌধুরী ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ নুরুল হক এর উপস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকে হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে নি¤œতম মজুরি বাস্তবায়নের জন্য ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা দেওয়া পরও সিলেট জেলায় হোটেল রেস্তোরাঁ খাতে নিম্ন তম মজুরি ও শ্রমআইন বাস্তবায়নের কার্যকর কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। এমনকি ইউনিয়নের পক্ষ থেকে শ্রমআইন বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও সরকার ঘোষিত নিম্ন তম মজুরি ও শ্রমআইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে শ্রমিকরা বঞ্চিত। শ্রম আইনে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ ও বাসস্থানের বিধান থাকলেও হোটেল শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে ও থাকতে বাধ্য হয়। দৈনিক ১০/১২ ঘন্টা অমানবিক পরিশ্রম করে অর্ধাহারে-অনাহারে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হতে হয়। দাবি ও অধিকার আদায়ের প্রশ্নে শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রাম ব্যতিত আর কোনো পথ নেই তাই মহান মে দিবসের বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার আহবান জানান।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *