আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: তার নাম নুরান শাহ। বাড়ি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বালাকোট এলাকার জাব্বা গ্রাম। মঙ্গলবার ভোরে এই বালাকোটেই বিমান হামলা চালিয়েছিলো ভারতের বিমান বাহিনী। ওই হামলায় তিন থেকে সাড়ে তিনশ জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছিলো নয়াদিল্লি। তবে তাদের এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর পাকিস্তান বলছে, ওই হামলায় কেউ মারা যায়নি, কেবল কিছু পাইন গাছ ভেঙেছে।
তবে বালাকোটে যে ওইদিন একটি কাক মরেছে তা কিন্তু সত্যি। তবে কাকটি ভারতীয় বিমান হামলায় মারা গেছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কাক মারা যাক বা না যাক, এই হামলার পর কিন্তু রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেছেন ৬২ বছরের নুরান শাহ। কারণ বালাকোটে ভারতের এক ডজন মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমানের আচমকা হামলা এবং ১০০০ কেজির স্মার্ট বোমা ফেলে আসার পর যে সবেধন নীলমণি ‘আহত’ ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া গেছে, তিনি এই নুরান শাহ।
কিন্তু তিনি এখনও মনে করতে পারছেন না, মঙ্গলবার রাতভোরে বালাকোটের পাহাড়ের মাথার জঙ্গলে নিজের মাটির বাড়িতে ঠিক কী কারণে তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল! মাটি কেঁপে ওঠায়? বিস্ফোরণের শব্দে? নাকি অন্য কোনও কারণে। ডান চোখের ওপরে যে ছোট কাটা দাগ, তাই–ই বা কী করে হল, সেটাও মনে করতে পারছেন না।
কিন্তু দেশ–বিদেশের সাংবাদিকরা এসে সেটাই বারবার জিজ্ঞেস করছে। আর এতেই বিরক্ত হচ্ছেন নুরান। তার বিরক্তির আরও বড় কারণ, ভারত নাকি জইশ–ই–মুহাম্মদ জঙ্গিদের ধ্বংস করতে অতগুলো যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল, অত বোমা ফেলেছে! শোনার পর থেকে নুরান মেজাজ হারাচ্ছেন। এক সাংবাদিক ফের একই কথা বলায় প্রায় দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলেছেন, ‘আমাকে দেখে কি আপনার জৈশ জঙ্গি মনে হচ্ছে? নাকি এখানে আরও জঙ্গিদের দেখতে পাচ্ছেন?’
যদিও রাশি রাশি জঙ্গি মারার দাবি থেকে ক্রমশ পা ঘষে ঘষে পিছু হঠছে ভারত। কারণ এত বড় একটা বোমাবাজির পর না কোনও ধ্বংসস্তূপ, না মৃতদেহ। অথচ খোদ পররাষ্ট্রসচিব বিজয় গোখেল বিমান হামলার পর জানিয়েছিলেন, বহুসংখ্যক শিক্ষানবিশ জঙ্গি, তাদের প্রশিক্ষক এবং জইশ–ই–মহম্মদের ওপরের সারির কমান্ডাররা খতম!
ভারতের আরেক সরকারি প্রতিনিধি দাবি করেছিলেন, অন্তত ৩০০ জইশ জঙ্গিকে হত্যা করা গেছে।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর ভাইস মার্শাল আর জি কে কাপুর বলেছেন, হতাহতের হিসেব এত তাড়াতাড়ি দেওয়া যাবে না। তবে ক্ষয়ক্ষতি কতটা হয়েছে তার ‘মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’তাদের হাতে আছে।
ওদিকে জাব্বা গ্রামের বাসিন্দারা বিদেশি সাংবাদিকদের মহা উৎসাহে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ঢালের মাটিতে বড় বড় চারটে বোমার গর্ত দেখিয়ে দিচ্ছেন। দেখাচ্ছেন, কোন কোন পাইন গাছ বিস্ফোরণের ঝটকায় ভেঙে পড়েছে বা পুড়ে গেছে।
ছোট মালবাহী গাড়ি চালান আবদুর রশিদ। বালাকোটের পাহাড়ি রাস্তা দিয়েই রোজ তার যাতায়াত। তিনি জানিয়েছেন, কিছু গাছ ভেঙেছে শুধু। কেউ মারা যায়নি, বা জখম হয়নি। তবে একটা কাক মরে পড়ে থাকতে দেখেছেন রাস্তায়। সেটা কার কেরামতি, জানা নেই।
ওসামা বিন লাদেনের সর্বশেষ ডেরা হিসেবে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া অ্যাবোটাবাদের ৪০ কিমি দূরে পাইন গাছে ছাওয়া বালাকোট অঞ্চল পাকিস্তানি পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য। নিঝুম পাহাড়ি রাস্তা ধরে গেলে মনোরম কাঘান উপত্যকার আদিগন্ত বিস্তার। জঙ্গলে ঘেরা এলাকায় ৪০০ থেকে ৫০০ লোকের বাস। পাহাড়ি ঢালে ছড়িয়ে থাকা মাটির বাড়ি। ২০০৫ সালের ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে যাওয়ার পর সব নতুন করে বানানো হয়েছে।
সেখানকার ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে রয়টার্স এক নুরান শাহ ছাড়া আর কোনো হতাহতের খোঁজ পায়নি।
জাব্বার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মী মহম্মদ সাদিক, যিনি হামলার রাতে ডিউটিতে ছিলেন। তিনি ভারতের অন্তত ৩০০ জঙ্গির নিহত হওয়ার ‘খবর’ শুনে বলেছেন, সব বাজে কথা! তা হলে তো অন্তত কিছু জখম লোক চিকিৎসার জন্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসত। কেউ আসেনি।
বালাকোট তহশিলের সদর হাসপাতালের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার জিয়া উল হকও একই কথা বলেছেন।
তবে বোমা যে ধারেকাছেই পড়েছে, তাতে যে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হতে পারত, সেটাও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যাচ্ছে।
জাব্বা গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ জাকির প্রথম বিস্ফোরণের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে ঘরের বাইরে গিয়েছিলেন। মা ডাকতে আবার ভেতরে যান। তখনই দ্বিতীয় বোমাটি পড়ে জাকিরের বাড়ি থেকে অল্প দূরে। সেখানকার মাটিতে এখন প্রায় ফুট দশেক গভীর এক গর্ত।
২৮ বছরের চৌধুরি শাফাকৎ আওয়াইস জানিয়েছেন, ২০০৫ সালের ভূমিকম্পের দুঃস্বপ্নই ফিরে এসেছিল ঘুমের মধ্যে, বিস্ফোরণের প্রাবল্যে যখন মাটি কেঁপে উঠেছিল। সকালে উঠে ব্যাপারটা বোঝার পর যে কারণে সবাই বিরক্ত।
সেখানকার বাসিন্দা শওকত কুরেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আপনারাই খুঁজে দেখুন। এখন এখানে কোথায় জঙ্গি, কোথায় কী! যত সব ফালতু কথা।’


