আন্তর্জাতিক ডেস্ক -
নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত ঘটানো হিমবাহ ধসের আগে ওই এলাকায় বছরের এই সময়ের তুলনায় নজিরবিহীন তাপমাত্রা বিরাজ করছিল। এক গবেষকের আবহাওয়া-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডন বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা পাহাড়ের হিমবাহ এলাকায় ২১ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি ওই সময়ের জন্য অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রা। গত ৫৫ বছরেরও বেশি সময়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে সেখানে তাপমাত্রা কখনোই ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ায়নি। তবে এই অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে হিমবাহধসের সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলি আর্থের প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট রোডে এই তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী,হিমবাহধসের স্থানে ২১ থেকে ২৬ আগস্টের গড় তাপমাত্রা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।রোডের হিসাব বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত উষ্ণতা না থাকলে এমন তাপমাত্রার পরিস্থিতি কয়েক হাজার বছরে একবার ঘটার মতো বিরল হতে পারত।
ইউরোপের কোপার্নিকাস পর্যবেক্ষণ সংস্থার ১৯৭০ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হিমবাহধসের সময় লাংটাং অঞ্চলে ওই বছরের গ্রীষ্ম ছিল রেকর্ডের মধ্যে চতুর্থ উষ্ণতম।
অতিরিক্ত গরম কি হিমবাহধসের কারণ?
ফরাসি জলবায়ুবিদ ভ্যালেরি ম্যাসোঁ-দেলমোত বলেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে পাহাড়ের জমাট মাটি বা ‘পারমাফ্রস্ট’ গলে যেতে পারে, যার ফলে পাহাড়ের ঢাল ও হিমবাহ একসঙ্গে ধসে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পারমাফ্রস্ট অনেকটা বরফের সিমেন্টের মতো কাজ করে, যা পাহাড়ের পাথর ও ঢালকে শক্ত করে ধরে রাখে। এটি গলে গেলে পাহাড় আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
দুর্যোগের কয়েক দিন আগে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরফ গলার প্রমাণও পেয়েছে স্যাটেলাইট। ফ্রান্সের সিএনআরএসের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ এতিয়েন বের্তিয়ের বলেন, গলা বরফের পানি পাহাড়ের ফাটলে ঢুকে ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত করে বলছেন না যে তাপপ্রবাহই পাহাড়ধসের সরাসরি কারণ।গ্রেনোবল আল্পস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রূপ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেন কুক বলেন, শুধু তাপমাত্রা বেড়ে গেলেই পাহাড়ধস হয়—বিষয়টি এত সরল নয়। তার মতে, তাপমাত্রা যদি ধসের ট্রিগার হয়ে থাকে, তাহলে পাহাড়টি আগে থেকেই ধসের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল।
গবেষকেরা এখন পাহাড়ধসের আগের বছরগুলোতে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নড়াচড়া এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখছেন।
রবার্ট রোডের মতে, গলা বরফের পানি বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে পাহাড়ের ফাটলের আশপাশের পাথর উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটিই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে।