প্রত্যাশিতভাবেই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। এছাড়া কিছুক্ষণের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।মন্ত্রিসভা থেকেও পদত্যাগ করবেন।
সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে মির্জা ফখরুলই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, এটা প্রায় পরিষ্কারই। আর তিনি রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারের তিনটি পদ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এখন সামনে আসছে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ মহাসচিবের উত্তরসূরি কে হবেন—সে প্রশ্ন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে—এ নিয়ে দলের ভেতরে কয়েক দিন ধরে তিনজন নেতার নাম বেশি আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে দুজন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অন্যজন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে।
বিএনপির রেওয়াজও তাই। এর আগে মির্জা ফখরুল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে ছিলেন। পরে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। সবশেষ কাউন্সিলে ভারমুক্ত হন তিনি।
তবে বিএনপির একটি অংশের চাওয়ার স্থায়ী কমিটি থেকে মহাসচিব হোক। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় সালাহউদ্দিন ও আমির খসরু। তবে এই দুজনই তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ভার সামাল দিচ্ছেন। এ কারণে তাদের মহাসচিব নাও করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে তার মন্ত্রণালয়ে নতুন কাউকে দেওয়া হবে, নাকি বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
আজ বিকাল চারটার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত আছে। এরপর যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট, সংসদের সভাকক্ষে।
সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধীদের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারীসহ ৯০। ফলে ভোটে বিএনপি–সমর্থিত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন, এটা অনেকটাই পরিষ্কার।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে।
সংবিধানের ৫০ (১) ধারায় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে শর্ত থাকে যে রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। দুই মেয়াদের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে পারেন।’
সংবিধানে আরও বলা আছে, রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে থেকে সংসদ সদস্য পদে থাকা যাবে না এ নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না। সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের দিনেই সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে।
তবে কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হলে শুধু নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মন্ত্রিত্ব শেষ হয়ে যায়—এমন সরাসরি বিধান নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার আর মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদকে সরকারের মন্ত্রিসভার কাঠামোর অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪৮(২) বলছে, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান।
অতীতে আবদুর রহমান বিশ্বাস, আবদুল হামিদসহ অন্যান্য নেতা স্পিকার বা মন্ত্রিসভা থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তারা তাদের পূর্বের পদ ত্যাগ করেছিলেন।
এদিকে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তার ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। এখন জোর আলোচনা চলছে যে, কে হতে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে সেখানে শিগগিরই উপনির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।
মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা বাবার আসনে নির্বাচন করতে পারেন বলে জানা যাচ্ছে। তিনি গত নির্বাচনে বাবা মির্জা ফখরুলের জন্য ভোটের মাঠে কাজ করেছেন। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক। দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সেখানে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য তার বেশ পরিচিতি রয়েছে।
এ ছাড়া আলোচনায় আছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। এর আগে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় তিনি।তিনি ফখরুলের ভাই।


