‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে মেজর জাহিদকে হত্যা

সিলেট নিউজ টাইমস্ ডেস্ক –

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানার কারণে পরিকল্পিতভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে হত্যা এবং পরে তার স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এখানেই শেষ নয়, স্বামীকে হত্যার পর স্ত্রী জেবুন্নাহার ও তার দুই মেয়েকে চোখ বেঁধে ডিবির ‘আয়নাঘরে’ ৪ মাস ৭ দিন গুম করে রাখে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

স্বামীকে জঙ্গি বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে জেবুন্নাহারের ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এই জঘন্যতম হত্যা ও গুমের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বৃহস্পতিবার এ মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের পিলখানায় পোস্টিং দেওয়া হয়। সেই তালিকায় মেজর জাহিদেরও নাম ছিল। তিনি এতে আগ্রহী ছিলেন না; তাই যোগদান করেননি। তখন পিলখানায় জাহিদের কোর্সমেট শহীদ ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দারের পোস্টিং ছিল। ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের ওপর এক মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। ঘটনার দিন শহীদ ক্যাপ্টেন মাজহারুল জাহিদকে ফোনে বলেছিলেন, আমাদের সব অফিসারকে মেরে ফেলেছে।

কারা মেরেছে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন মাজহার বলেন, কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তি, যারা বিডিআর-এর পোশাক পরা ছিল। যাদের কখনোই পিলখানায় আগে দেখিনি। মেজর জাহিদ তখন বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। ঘটনা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে ক্যান্টনমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। জাহিদ পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। তিনি মাজহারুলের কাছ থেকে অনেক কিছুই জেনে গিয়েছিলেন। তাই হাসিনা সরকার তাকে টার্গেট করে নজরদারিতে রাখত।

অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, সেনাবাহিনীতে অযোগ্য অফিসারের পদোন্নতি এবং নানা বিশৃঙ্খলা জাহিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি দেখলেন, চাটুকার ও অযোগ্য অফিসারদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে উত্তরায় ভাড়া বাসায় উঠেন।

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর গোয়েন্দারা জাহিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জাহিদ। বাসা বদল করে উত্তরা থেকে রূপনগরে চলে যান। কিন্তু হাসিনা সরকার জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সেই মোতাবেক ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে জাহিদকে হাত বেঁধে বাসার নিচে নিয়ে যায় রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল। এরপর নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

এর আগে রাত ১০টার দিকে আসামিরা জেবুন্নাহারকে তার দুই শিশুসন্তানসহ চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তখন জেবুন্নাহার জানতে চান, তার স্বামী কোথায়? পুলিশ তখন বলতে থাকে, তিনি ও তার স্বামী জঙ্গি, এই স্বীকারোক্তি না দিলে তাকেও তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে পুলিশের কোনো একজন জানান, তারাই মেজর জাহিদকে হত্যা করেছে।

 

গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর পৃথক অভিযোগ করেন জেবুন্নাহার। অভিযোগে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) তৎকালীন প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শাহীদ আলম, ডিসি ডিবি কৃষ্ণ পদ রায় ও রূপনগর থানা-পুলিশের তৎকালীন অজ্ঞাতনামা সদস্যদের আসামি করা হয়েছে।

প্রধান আসামি একেএম শহীদুল হককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দিয়েছেন।

জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহারকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। নেওয়া হয় মিথ্যা জবানবন্দি। একই সঙ্গে নিহত মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং জেবুন্নাহারের বিরুদ্ধে ২টি সাজানো জঙ্গি মামলা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।

জেবুন্নাহার ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী শহীদ মেজর জাহিদুল ইসলামকে হত্যার পর আমার ওপর নেমে আসে অমানবিক, নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম নির্যাতন। আসামিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার স্বামীকে জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন না হলে হয়তো আমাকে ধুঁকে ধুঁকে জেলখানায় মরতে হতো অথবা বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা হতো।

জেবুন্নাহারের ভাই জাহিদুল হক মজুমদার বলেন, জাহিদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দীর্ঘদিন পড়ে ছিল। লাশ নিতে চাইলেও পরিবারের কাছে দেওয়া হয়নি। আড়াই বছর পর বেওয়ারিশ হিসাবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে তার লাশ হস্তান্তর করলে অনেক কষ্টে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *