মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি: দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দিতে গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করেছে দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া, পরিবেশ ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা খাতে অবদান রাখা জেলার প্রায় ৩০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আগামী ২২ মার্চ ২০২৬ মুন্সিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এর মধ্যে শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পাচ্ছেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ছটকু আহমেদ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পাচ্ছেন জাতিসংঘের আইসিটি কর্মকর্তা (অব.) নজরুল ইসলাম। আজকের পর্ব বিশিষ্ট দুই গুণীজনকে নিয়ে।
ছটকু আহমেদ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের একজন বিশিষ্ট নির্মাতা সৈয়দ উদ্দিন আহমেদ যিনি ছটকু আহমেদ নামে অধিক পরিচিত। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে দেশের চলচ্চিত্র জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। ১৯৪৬ সালের ৬ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর অঞ্চলের সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের পানহাটা গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবকাল থেকেই সাহিত্য, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁকে সৃজনশীল জগতে প্রতিষ্ঠিত করে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নাট্য পরিচালনার মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটক অবলম্বনে একটি মঞ্চনাটক পরিচালনা করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি “অমর জীবন” নামে একটি ধারাবাহিক নাটক রচনা করেন এবং একই বছরে “দিঠি” নামে আরেকটি নাটক পরিচালনা করেন।
চলচ্চিত্রে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদার্পণ ঘটে ১৯৭২ সালে। সে বছর প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। এরপর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সাড়ে তিন শতাধিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেন। তাঁর রচিত বহু চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে।
পরিচালক হিসেবে ছটকু আহমেদের নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে— নাত বৌ (১৯৮২), রাজদণ্ড (১৯৮৪), গৃহবিবাদ (১৯৮৬), অত্যাচার (১৯৮৭), চেতনা (১৯৯০), মায়া মমতা (১৯৯৪), সত্যের মৃত্যু নাই (১৯৯৬), বুকের ভিতর আগুন (১৯৯৭), মিথ্যার মৃত্যু (১৯৯৮), বুক ভরা ভালোবাসা (১৯৯৯), বর্ষা বাদল (২০০০), শেষ যুদ্ধ (২০০২), মহা তাণ্ডব (২০০২), আজকের রূপবান (২০০৫), প্রতিবাদী মাস্টার (২০০৫) এবং আহারে জীবন (২০২৪)। এর মধ্যে “সত্যের মৃত্যু নাই” চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৭৯ সালের ১৮ নভেম্বর মাসরুবাহ আহমেদ এপির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের চার কন্যা সন্তান রয়েছে এবং তারা সবাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁদের সর্বকনিষ্ঠ কন্যা নাজিয়া আহমেদ শ্বেতা সোনারগাও ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অধিনায়ক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
চলচ্চিত্রে সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ছটকু আহমেদ ১৯৮৬ সালে “গৃহবিবাদ” চলচ্চিত্রের জন্য কাহিনী, গীত রচনা ও সংলাপ রচনায় বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে “সত্য মিথ্যা” চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও ২০১৮ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর আইডিইবি স্বর্ণপদক এবং একই বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি ও শিল্পী ঐক্যজোটের আজীবন সদস্য হিসেবেও যুক্ত আছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ছটকু আহমেদ একজন নিবেদিতপ্রাণ স্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর সৃষ্ট গল্প, সংলাপ ও নির্মাণশৈলী দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নজরুল ইসলাম
তিনি ১৯৫৮ সালের ২ মে খাসমহল বালুচর গ্রামে একজন সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে এস এস সি, ৭৫ সালে এইচ এস সি, ৭৭ সালে বি এসসি এবং ১৯৮১ সালে ফলিত গনিত ও কম্পিউটার সাইন্সে এম এস সি পাশ করেন। বিএস সি পাশ করার পর , ১৯৭৮ সালে প্রায় এক বছর নিজ স্কুল খাসমহল বালুচর উচ্চবিদ্যালয়ে এবং পরে বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমীতে চার বছর শিক্ষকতা করেন। অতঃপর এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, ব্যাংকক থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে তিনি কম্পিউটার পেশায় নিয়োজিত হন এবং পর্যায়ক্রমে কৃষিব্যাংক, প্রশিকা, এল জি ই ডি, ও কানাডিয়ান হাই কমিশনে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসাবে চাকুরী । ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ন হয়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তর সহ বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক অফিসে আইসিটি বিশেষজ্ঞ হিসাবে চাকুরী করেন। জাতিসংঘের পাসপোর্ট নিয়ে তিনি পৃথিবীর বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন। প্রায় ২০ বছর চাকুরীর পর, জাতিসংঘের পেনশনভুক্ত কর্মকর্তা হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সন পর্যন্ত খাসমহল বালুচর স্কুলের এক ক্রান্তিকালীন সময়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি নানাবিধ সামাজিক কাজে জড়িত। তিনি দুই পুত্রের জনক। বড় ছেলে অর্থনীতিতে এম,এস,সি ও কানাডার অভিবাসী। ছোট ছেলে কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক ডিগ্রী শেষে, ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি, অষ্ট্রেলিয়ায় এম এস করছেন।
মুন্সিগঞ্জের বার্তার গুণীজন সংবর্ধনা ২০২৬ সম্মাননা পাচ্ছেন ছটকু আহমেদ ও নজরুল ইসলাম
কমেন্ট
