বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতিপূর্ণভাবে বাঁচার মত মজুরি ঘোষণাসহ ১০ দফা দাবিতে শ্রম উপদেষ্টা বরাবর চা শ্রমিক সংঘ’র স্মারকলিপি পেশ

নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্যে যখন মধ্যবিত্তের জীবনে নাভিশ্বাস উঠছে তখন একজন চা-শ্রমিক কি করে দৈনিক ১৮৭.৪৩ টাকা মজুরিতে ৫/৬ জনের পরিবার চালাবে?  

বাংলাদেশে শিল্প সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকরা। নি¤œতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩ টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টরের মজুরির সাথে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম। চা-শ্রমিকরা বংশ পরস্পরায় প্রায় ২০০ বছর যাবত চা-বাগানে বসবাস করে বনের বাঘ-ভাল্লুক, সাপ-জোঁকসহ হিংসা জীবজন্তুকে মোকাবেলা করতে গিয়ে অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে চা-শিল্পকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। অনাহার-অর্ধাহার ক্লিষ্ট চা-শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চা-উৎপাদন বৃদ্ধি হয়। অথচ শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বাঁচার মতো মজুরি ঘোষণা সহ ১০ দফা দাবিতে সিলেট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শ্রম উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে চা শ্রমিক সংঘ সিলেট জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ।
সকাল ১১টায় সিলেটের জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন এডিসি সার্বিক নূরে আলম সিদ্দিকী বরাবর সংগঠনের প্রতিনিধি দল পেশ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চা শ্রমিক সংঘ সিলেট জেলা কমিটির সহ-সভাপতি কমলা বেগম, সাংগঠনিক সম্পাদক শুভ মণি দাস, সহ সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ছাদেক মিয়া, সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী পটু, সিলেট জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি মীর মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা কমিটির প্রচার সম্পাদক সুনু মিয়া।

স্মারকলিপিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশে চা একটি অর্থকরি ফসল, সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১ কোটি কেজির বেশি চা রপ্তানি হয়। চায়ের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু নীতিমালা ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই শিল্পকে অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত করা। এই শিল্পের প্রধান কারিগর চা শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চা উৎপাদন করে মালিকের মুনাফার পাহাড় গড়ার উপাঙ্গে পরিণত হয়েছেন। চা শ্রমিকদের উপর শোষণ-লুণ্ঠন, নিপীড়ন-নির্যাতনের এহেন মাত্রা প্রাচীন দাস সমাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, চা-শিল্প রক্ষা বলতে মালিকরা শুধু তাদের বল্গাহীন শোষণ-লুণ্ঠনকেই বুঝান। অথচ চা শ্রমিককে বাদ দিলে এই শিল্পের অস্তিত্ব থাকেনা।
যাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে চায়ের উৎপাদন ও মুনাফা অব্যাহতভাবে বাড়ছে বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে সেই চা-শ্রমিকদের মজুরি (সম্প্রতি ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদানের পর) সর্বোচ্চ ‘এ’ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১৮৭.৪৩ টাকা এবং ‘বি’ ও ‘সি’ ক্লাস যথাক্রমে ১৮৬.৩২ টাকা এবং ১৮৫.২২ টাকা। শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে চা-শিল্পের ১৭০ বছর পর ২০২৪ সাল থেকে ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়, যদিও এক্ষেত্রে বছরের পর বছর কাজ করে যাওয়া একজন অভিজ্ঞ চা-শ্রমিক ও একজন নবীন চা-শ্রমিককে মজুরি সমান হারে প্রদান করা হচ্ছে। অতীতে চা-শ্রমিকরা রেশন হিসেবে চাল, আটা, ডাল, চিনি/গুড়, লবন, সাবান, লাকড়ি, কেরোসিন ইত্যাদি পেয়ে থাকলেও বর্তমানে রেশন হিসেবে প্রতি সপ্তাহে একজন চা-শ্রমিককে ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম চাল বা আটা প্রদান করা হয়, যাদের ক্ষেতের জমি আছে তাদের রেশন হতে প্রতি বিঘায় বার্ষিক ১১২ কেজি চাল বা আটা কেটে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের রেশন হিসেবে যে চাল বা আটা প্রদান করা হয় তা খাবার যোগ্য থাকে না। আবার চাল বা আটা প্রদানের ক্ষেত্রে যখন যেটার দাম কম হয় তখন সেটা প্রদান করা হয়।
একজন শ্রমিকের দৈনিক পরিশ্রমের পর পরবর্তী দিন কাজে যোগদানের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে দৈনিক তিন বেলা অতি সাধারণভাবে আহারের জন্য ২৫০/- (৫০+১০০+১০০) টাকা দিলেও পেট ভরে না। তাই স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ মা-বাবাকে নিয়ে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ১,০০০/- টাকা দরকার। বাংলাদেশে ক্রিয়াশীয় জাতীয় শ্রমিক সংগঠনসমূহ জাতীয় ন্যূনতম মূল মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। অথচ নি¤œতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টরের মজুরির সাথে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি অত্যন্ত কম।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *