চুনারুঘাট: ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধানে

“এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম “(সুফি লেখক, গবেষক ও ঐতিহাসিক) সৌজন্যেঃ আবু সালেহ আহমদ ( ঐতিহাসিক ও লেখক)

চুনারুঘাট উপজেলা হবিগঞ্জ জেলার একটি ঐতিহাসিক ও অতীত প্রশাসনিক এলাকা। অতি প্রাচীনকালে (খোয়াই) নদীপথে প্রচুর চুনাপাথর এই অঞ্চলে আসত। ব্যবসায়ীগণ এখানে এসে চুনাপাথর ক্রয়-বিক্রয় করতেন। প্রথমে লোকে বলত চুনা পাথরের ঘাট,কালক্রমে এটি হয়ে ওঠে এখন ঐতিহ্যবাহী জনপদ চুনারুঘাট। এই উপজেলায় রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভবনা।

কিংবদন্তি মতে এ উপজেলার রাজাপুরে টিপরা রাজা আচকনারায়ণের রাজধানী ছিল। আচকনারায়ণ ১৩০৪ সালে বাংলার সুলতান ফিরুজ শাহের সেনাপতি সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন। পরবর্তিতে তরফ রাজ্যের একটি অংশও ছিল এই চুনারুঘাটে। এসব ইতিহাস আমরা অনেকেই জানলেও আরো পূর্বের ইতিহাস আমাদের ছিল অজানা।শেকড় সন্ধানী ইতিহাসবিদ কলিম উল্লাহ সিলেট বিজয় নামে একটি ইতিহাস গ্রন্থ লিখতে গিয়ে, বিভিন্ন এলাকার (লাউড়,বানিয়াচং বিশেষ করে তরফের) ইতিহাস নিয়ে আমাদের সাথে প্রায়ই নানা ঘটনা,বিষয় বা ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেন। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থের আলোকে তিনি জানান, “আচক নারায়ণের বহু আগে তরফ এলাকায় বা চুনারুঘাটে মুসলিম বিজিতের শাসন ছিল এবং এসব শাসকদের অত্র এলাকায় সমাধি রয়েছে বলে বিভিন্ন আরবি ফার্সি গ্রন্থ ও শিলা লিপিতে প্রমাণ রয়েছে । এ সুত্র ধরে গত সপ্তাহে ছুটির দিনে আমরা ‘ক’জন চুনারুঘাট সরজমিনে পরিদর্শন করি। প্রথমে হয়রত চাশনি পীর রহঃ মাজার জিয়ারত করে আমাকে এগিয়ে নিতে আসেন কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম , এ সময় জৈন্তা থেকে এসে আমাদের সাথে যোগদেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ জনাব মোঃ কলিম উল্লাহ। সিলেট থেকে আমরা যখন মিরপুর পৌঁছি আমাদের সাথে যোগদেন আরেক বরেণ্য লেখক ও ইতিহাসবিদ দেওয়ান মাসুদুর রহমান চৌধুরী ও এডভোকেট আশরাফ উদ্দিন তরফদার। প্রথমেই আমরা যাই চুনারুঘাটের চিচির কোর্ট এলাকায়। কিংবদন্তি মতে এই এলাকায় নাকি জলকর আদায়ের নিমিত্তে কোর্ট বিদ্যমান ছিল।

কথিত মতে,আলী ইলিয়াছ রহঃ এর মাজার জিয়ারত করে আমরা পৌঁছি দেউলগাঁও গ্রামে। গ্রামের তরফদার বাড়ির সামনে পুরনো একটি মাজার জিয়ারত করি, তারিখ- ই ফিরোজ শাহী ও তবাকাত- ই নাসিরীর উদৃতি দিয়ে ইতিহাসবিদ কলিম উল্লাহ বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, এই মাজার হয়রত তাজউদ্দীন কোরেশি রহঃ এর বাবা হয়রত জইন উদ্দিন রহঃএর হতে পারে” । তার মতে,”মাজারের সন্নিকটে ইট গুলো ও পাথরটি মধ্যযুগের। তারিখ- ই ফিরোজ শাহীর রেফারেন্সে এই ইট,পাথর, ও মাজারের কাছে মাসজিদ দিঘির কথা উল্লেখ আছে। ইটগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে এর আয়তন প্রায় ছয় ইঞ্চি। মাজারের কাছে প্রায় ৫০০ বছর পূর্বের একটি বট গাছ রয়েছে, ধারণা করা যায়, মাজারে শ্যাওলা থেকে এই বটগাছটি জন্মেছিল।ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্রোহী শাসক তুঘরিলকে হত্যার পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন উক্ত চিচির কোর্টে হয়রত জইন উদ্দিন শর্কি শক্কর (রহ) (পূর্বরাজ) কে ১২৮১ খৃীঃ এ অঞ্চলের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করে ছিলেন। আরবি তরফ’ এবং ফারসি দার’ মিলে তরফদার শব্দের সৃষ্টি। রাজ্যের খাজনা আদায়ের মহালে তদারককারী বা খাজনা আদায়কারীর উপাধী ছিল তরফদার। এই পদবী ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর পূর্ব পুরুষরা রাজকার্য পরিচালনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, সেখান থেকেই এই বংশ পদবী উৎপত্তি ও প্রচলন। অন্যমতে তরফদার তরফের রাজস্ব আদায়কারী লোক, তরফের মালিক, পদবী বিশেষ।
এই বাড়ির পূর্ব পূরুষেরাও অত্র এলাকার খাজনা আদায় করতো বলে কিংবদন্তি রয়েছে। বিশিষ্ঠ লোকগবেষক মরহুম ইসমাইল তরফদার এর বাড়ি পরিদর্শন ও তাঁর চাচাতো ভাইয়ের বাড়িতে চা খেয়ে দেউল গাও পেরিয়ে আমরা এক সময় শায়েস্তাগঞ্জের সন্নিকটে নিশাপটে লস্কর বাড়িতে যাই। আন্তরিকতার সাথে আমাদের দূপুরের আপ্যায়ন করান সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট (অবঃ) জনাব মোঃ সেলিম মিয়া। দুপুরের খাবার শেষে আমরা হবিগঞ্জের প্রাচীন মুসলিম নিদর্শন হযরত খোরাসানী বিবি সাহেবা রহঃ এঁর মাজার জিয়ারত করি। সেখানে স্থানীয় বিশিষ্ট লোকজনের সমাগম ঘটে।
মাজার জিয়ারত শেষে ঐতিহাসিক জনাব কলিম উল্লাহ মিনহাজ-ই সিরাজের বিখ্যাত গ্রন্থ তবাকাত- ই নাসিরীর (১২৬০)বরাত দিয়ে স্থানীয় জনগণের কাছে হয়রত খোরাসানী বিবি রহঃ সাহেবার পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, হয়রত খোরাসানী বিবি হচ্ছেন সুলতান তাজউদ্দীন সনজর আরসালান খানের স্ত্রী এবং মালিক বাহাউদ্দিন তুঘরিল খোরাসানীর মেয়ে। ১২৫৭-৫৯ খৃষ্টাব্দে সুলতান আরসালমান খান তাঁর পুত্রদ্বয় সুলতান মোহাম্মদ তাতার খান ও সুলতান শেরখানসহ বহু লোক-লস্কর নিয়ে অত্র অঞ্চলে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সাহায্যে যুদ্ধে আগমন করেন এবং এ অঞ্চলে মুসলিম রাজ্য বিস্তার ও ধর্ম প্রচার করেন। এ অভিযান কালে তাঁর স্ত্রী ইন্তেকাল করায় এখানে তাঁর সমাধি স্থাপন করেন এবং সঙ্গী লস্করদের বসতি স্থাপন করে দেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন পরবর্তীতে মালিক তাজউদ্দিন সনজর আরসালান খান কে বাংলার শাসক (১২৫৯-১২৬১)হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে দিল্লি গমণ করেন। এই অঞ্চলে খোরাসানী বিবির( রহঃ) এর মাজার ও তাদের সঙ্গী লস্করদের স্থায়ী বসতি স্থাপন ১২০০ খৃষ্টাব্দের ষাটের দশকে ইসলামী রাজ্য বিস্তার ও মুসলিম বসতির সাক্ষ্য-প্রমাণ বহন করে। তরফ অঞ্চল অধিকারের সূত্র ধরেই এ অঞ্চলের লস্কর বাড়ির লোকজন তরফদার পদবী ব্যবহার করে থাকেন । সবশেষে আমরা হযরত খোরাসানী বিবির পুত্র সুলতান মোহাম্মদ তাতার খান রহঃ এঁর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে চুনারুঘাটের চুরতা গ্রামে অবস্থিত বড় বাদশাহের মোকামে গমন করি। পথে স্থানীয় বাজারে চা খাওয়ার সময় এলাকার লোকজনের সাথে কথা হলে তারা বড় বাদশার মোকাম ও এ ওলির নানা কেরামত বর্ণনা করেন।
সুলতান মোহাম্মদ তাতার খান তাঁর পিতার পরবর্তীতে (১২৬১-১২৭৪) খৃীঃ পর্যন্ত বাংলা ও বিহার শাসন করেন। তিনি ১২৭৪ খৃঃ সিংহাসন ত্যাগ করে তাঁর ভাই শের খানকে স্থলাভিষিক্ত করেন এবং আল্লাহ পাকের একনিষ্ঠ সাধনায় নিমগ্ন হন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সুখুমার মুখোপাধ্যায় তার বাংলার ইতিহাস গ্রন্থের ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন সুলতান মোহাম্মদ তাতার খান একজন সুফি দরবেশ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাই সুলতান শেরখানও রহঃ সিংহাসন ছেড়ে আল্লাহর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। চুনারুঘাটের দেওরগাছ ইউনিয়নের বাঘারুখে তাঁর মাজার অবস্থিত।
কিংবদন্তি মতে শেরখানের বাঘের মতো শক্তি সাহস ছিল বলে তার নামের অপভ্রংশ থেকে গ্রামের নাম হয় বাঘারুখ।কথিত মতে তাদের আরেক ভাই শায়খে আলী খাজা প্রকাশ সৈয়দ আলাউদ্দিন চাশনীগীর রহঃ সুফি দরবেশ হয়রত শাহজালাল রহঃ সাথে সিলেট বিজয়ে অংশ গ্রহণ করেন। এবং হয়রত শাহজালাল রহঃ সঙ্গে নিয়ে আসা পবিত্র একমুষ্টি মাটি পরখ করে সিলেটে আরবের মাটির মিল নিশ্চিত করেন। সিলেটের গোয়াই টুলায় তাঁর পবিত্র মাজার বিদ্যমান আছে। উল্লেখিত নিদর্শনগুলো হবিগঞ্জ অঞ্চলে সিলেট বিজয়ের পূর্বেই মুসলমান রাজত্ব ও বসতির সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। সর্বশেষ আমরা যাই ঐতিহাসিক মুড়ারবন্দ। প্রবল ঝড়ে যার বাতি নিভেনি বা যার জীবনে আছরের নামাজ কাযা হয়নি, যিনি গৌড় গোবিন্দের হাতিয়ার উত্তোলন করে তাকে প্রতিহত করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এই বীর ও সাধক সৈয়দ নাসিরুদ্দিন সিপাহসালার রহঃ এঁর মাজার জিয়ারত করে আমরা কাজির খিলে গমন করে, কাজী সাহেবের মাজার জিয়ারত করি।

 


ইতিহাস থেকে জানা যায় যে,৬৫৫ হিজরীতে (১২৫৭ খৃঃ) দীউল রাজ্য আক্রমণ কালে মালিক ইযর উদ্দিন বলবন ইউযবকী রহঃ ঔ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং মালিক সাইফ উদ্দিন আইবাক বতখান যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে অশ্ব থেকে পড়ে (পতিত হয়ে ) মারা গিয়েছেন। এ কারণে শামস উদ্দিনের মাজার চাটপাড়ায় এবং সইফ উদ্দিন আইবেক (বতখান) এ বং কাজী নুর উদ্দিনের মাজার কাজির খিলে (ইযর উদ্দিন বলবন ইউযবকি) এর ইতিহাসের সাথে এক ও অভিন্ন বলে মন হয়।
রাতেই আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। মুরারবন্দের খাদেম লেখক জনাব মুরাদ আহমদ সাহেবের ব্যবহার আমাদেরকে মুগ্ধ করে।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.