প্রশাসনিকভাবে দক্ষ বঙ্গবন্ধুর ১৩১৪ দিনের উপহার

সিলেট নিউজ টাইমস্ ডেস্ক:: টুঙ্গিপাড়ার রাখাল রাজার ৭ মার্চ আঙুলের হিলানোয় কম্পন সৃষ্টি হয়েছিলো শাষকের মসনদে। সকল ভয়কে দাঁপিয়ে বাঙালী তার অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলো। যখন পাকিস্তান হানাদাররা,আলবদরা বঙালীকে আর দাবিয়ে রাখতে পারলোনা তখন রাতের আধাঁরে ভয়ানক হত্যাকান্ড চালাতে বাধ্য হলো। ইতিহাসের সৃষ্ট সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক গণহত্যা চালায় ঘুমন্ত বাঙালীর উপর। ইতিহাসে আজও বাঙালী ছাড়া কোন জাতি এইরকম ন্যাক্কারজনকভাবে গণহত্যার শিকার হয়নি। বেলুচিস্তানের সেই কসাই টিক্কা খান বলেছিলো, আদমি নেহি মাংতা, মৃত্তি ভি নেহি অর্থ্যাৎ পোড়া মাটিতো নয়ই, কোন মানুষ থাকতে পারবেনা। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হলো। অথচ তারা জানতোনা বন্দী মুজিব কতো শক্তিশালী হতে পারেন। তোমার নেতা আমারে নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব স্বাধীন করো স্বাধীন করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো স্লোগানে দীর্ঘ নয় মাস চললো মুক্তিযুদ্ধ। চলমান যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হলো ৪ লক্ষের মতো মা, বোন তাদের ইজ্জত হারালো। ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা হলো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যা বাঙালীর ইতিহাসে কালোদিন হিসাবেই পরিচিত। অবশেষে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হলো বাঙালীর স্বাধীনতা। ৫৬ হাজার বর্গমাইলে প্রাণভরে শ্বাস নিলো বাংলার মানুষ। বাংলার আকাশে বুঁদবুঁদ করে উড়তে থাকলো লাল সবুজের পতাকা। কিন্তু সকল আনন্দ যেন হিমালয়ের বরফের মতো জমাটবদ্ধ হয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায়। অবশেষে ১০ জানুয়ারি বাঙালীর স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ফিরে আসলেন। ফিরে আসার আগে তিনি ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাহারের কথা বলে আসলেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে। যদি তিনি ফিরে না আসতেন তাহলে প্রেক্ষাপটটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো। দেশের বিভিন্ন জায়গায় একটু আধটু হত্যাকান্ড শুরু হয়েছিলো। যদি বঙ্গবন্ধু ফিরে না আসতেন তাহলে তা মহামারী আকার ধারণ করতো বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারও পক্ষে এইগুলো বন্ধ করা অসম্ভব ছিলো। কারণ বঙ্গবন্ধুর ছিলো আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা মানুষ বঙ্গবন্ধুকে প্রবল ভালোবাসতো এবং বিশ্বাস করতো। একটি সদ্যোজাত স্বাধীন দেশ ১৬ ডিসেম্বর যে ভূমিষ্ঠ হয়েছে। যার সরকারী কোষাগারে নেই কোন টাকা পয়সা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য নেই কোন পুলিশবাহিনী। প্রশাসনে অভিজ্ঞতা আছে এমন কোন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই আবার নেই কোন প্রশাসনিক কাঠামো। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভাট, বিদ্যুকেন্দ্র, অবকাঠামো ধবংস করে রেখে গিয়েছে হানাদার বাহিনী। পাকিস্তান আমলে সিভিল সার্ভিসের কর্মচারী বেশিরভাগ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীরা। ইয়াহিয়া শাসনের শেষের দিকে মাত্র চার-পাঁচজন সিএসপি অফিসারকে কেন্দ্রীয় সচিবের দায়িত্ব পেয়েছিলো। একটা অনভিজ্ঞ প্রাশাসনিক অবকাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করতেছে সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু বলতেন একটা ইউনিয়ন কাউন্সিল চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, এদের নিয়ে আমার একটা দেশ চালাতে হচ্ছে, এ কথাটি কেউ বুঝতে চায়না। তারপর আবার দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বললেন তলাবিহীন ঝুড়ি। ফাল্যান্ড ও পারকিনসন এক গবেষণা করে বললেন ” বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১ কোটি হলে ভালো হতো। কিন্তু জনসংখ্যা ৮ কোটি তাও আবার ক্রমবর্ধমান। যে মানুষটা তার রাজনীতির ৩২ বছর জীবনের ৪০ শতাংশ জেলে কাটালেন, যে মানুষটা তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে ১২ শতাংশ ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন অর্থ্যাৎ দিনে ৩ থেকে ৩.৫ ঘন্টা। সেই মানুষটার হাতে ৫৬ হাজার বর্গমাইল, সেই মানুষটার হাতে ৭ কোটি মানুষের ভাগ্য। সেই মানুষটাকে কেন্দ্র করে বাংলার সহজ সরল মানুষগুলো। মানুষ তার স্বপ্নের চাইতে বড় বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে জানতেন একজন নেতার সবথেকে বড় দক্ষতা হলো তার কর্মীকে স্বপ্ন দেখনো। বঙ্গবন্ধু নেমে পড়লেন দেশ গঠনে কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এই মানুষগুলো তাকে খুব ভালোবাসে এই মানুষগুলোর ভাগ্যের পরিবর্তনের দায়িত্ব উনাকেই নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু উনার শাসন ক্ষমতার ১৩১৪ দিনের নেয়া পদক্ষেপ নিম্নোক্ত ঃ

১.১২ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন।
২.মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে নির্ধারণ করেন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংঙ্গীত, রণ সংঙ্গীত।
৩.শরণার্থী পুনর্বাসন।
৪.ভারতীয় সৈন্যদের দেশে ফেরত।
৫.মুক্তিযুদ্ধাদের পূনর্বাসন।
৬. শহিদ ও আহত মুক্তিযুদ্ধাদের পূনর্বাসন।
৭. মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের বিচারের জন্য বাংলাদেশ দালাল অধ্যাদেশ প্রণয়ন।
৮. প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা কমিশন গঠন।
৯. যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন।
১০. টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা।
১১. কৃষি পুনর্বাসন।
১২. ১৩৯ টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন।
১৩.সংবিধান প্রণয়ন
১৪.প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস।
১৫.আন্তর্জাতিক অনুদান প্রাপ্তির কূটনীতি।
১৬.মুক্তিযুদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ।
১৭.ব্যাংক,বীমা,পাট,বস্ত্রকল,জাতীয় করণ।
১৮.বিদ্যু উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা।
১৯.১৯৭১ এর মার্চ ডিসেম্বরকালীন ছাত্র বেতন মওকুফ।
২০. প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ।
২১.ড.কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন।
২২. পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ঘোষণা।
২৩.বাজেট শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ।
২৪. ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল কলেজে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ।
২৫. শিক্ষকদের নয় মাসের বেতন দেয়া।
২৬.জরুরী ভিত্তিতে ১০৫ টি আইন প্রণয়ন।
২৭.কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ।
২৮.পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন।
২৯. রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ঘোষণা।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু বার বার পাকিস্তান আমলের আমলাতান্ত্রিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েও বেড়িয়ে আসতে পারেননি । বঙ্গবন্ধু প্রশাসনের বাইরে থেকে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিব করেছিলেন কবীর চৌধুরী, গৃহায়ন গণপূর্তমন্ত্রনালয়ে ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে ড. টি হোসেন, তথ্য মন্ত্রনালয় ভারপ্রাপ্ত পদে বাহাউদ্দিন চৌধুরীকে সচিব করেও সেখানে রাখতে পারেননি সেই পাকিস্তান আমলের আমলাতান্ত্রিক বলয়। ১ কোটি শরনার্থী এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লক্ষ লক্ষ মানুষজন বাংলাদেশে খাদ্য ঘটতি ছিলো ৪০ লাক্ষ মেট্রিক টন কিন্তু সেখানে মজুদ ছিলো মাত্র ৪ লক্ষ মেট্রিকটন বঙ্গবন্ধু সেই খাদ্য ঘাটতি সামাল দিতে সফল হয়েছিলেন। রাস্তাঘাট,ব্রিজ,কালভার্ট-বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত সেগুলো পুর্নগঠনের জন্য বিশাল অর্থ দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে পর্যাপ্ত অর্থের অভাব বঙ্গবন্ধু তখন কনসোর্টিয়াম বা সহায়-সংঘ গঠন করলেন উন্নত দেশগুলো নিয়ে। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর দ্বারা সম্ভব হয়েছিলো এবং বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে সকল দেশ সহযোগীতায় এগিয়ে এসেছিলো। আজও বাংলাদেশ সেই কনসোর্টিমায়ে সুবিধা নিয়ে থাকে। ৭৫ পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তাইতো বলেছিলেন মানি ইজ নো প্রবলেম। বঙ্গবন্ধু ইরানের কাছ থেকে তেল আনতে হয়েছে যখন ৭৪-এর তেল সংকটে অনেক দেশকে বিপাকে পড়তে হয়েছিলো। যুদ্ধের সময় সীমান্ত খুলে দেয়ায় শুরু হয়েছিলো অবাধ চোরাকারবার যা বন্ধ এবং সীমানা নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো। রাস্তাঘাট,ব্রিজ,কালভার্ট,বিদ্যুৎ,কর্ণফুলীর মোহনা পরিষ্কার এতো কিছু বঙ্গবন্ধুকে করতে হয়েছে কিভাবে কেউ বলতে পারেনা। “শেখ মুজিবের সংস্কারমূলক কর্মসূচিসমূহ, তাঁর সকল প্রসাশনিক সফলতা ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আলোচনা, সমালোচনা করার পরও একটা সত্য ভাস্কর হয়ে থাকবে যে, তিনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে একটি জাতিকে চিরদিনের জন্য গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার আশংকা থেকে মুক্ত করেছিলেন। কারাগারে নিহত হলে তিনি হয়তো শহীদ হয়ে অবিস্মরণীয় হতেন, কিন্তু বাংলাদেশে চলতো চরম অরাজকতা ও হানাহানি। খণ্ড – বিখণ্ড হতো দেশটি (বাংলায় বাংলাদেশে শেখ মুজিবের যুগ)। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশ অনেক আগেই মালেশিয়াকে ছাড়িয়ে যেত কারণ বৈশ্বিকভাবে বঙ্গবন্ধুর ছিলো আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আজকে বেগমান গতিতে এগিয়ে যেত ৫৬ হাজার বর্গমাইল। বঙ্গবন্ধু তার জীবনের শেষ জনসভায় (২৬ মার্চ ১৯৭৫ রেসকোর্স ময়দানে) বলেছিলেন আমি ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না। আজকে তারই কন্যার হাত ধরে বাঙালী জাতি বিশ্বের বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মাথাপিছু আয়, জিডিপি সারা বিশ্ব এখন অবাক তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের দিকে।

জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।

আবু বকর পারভেজ

সাবেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কমেন্ট