শিক্ষকের পিটুনিতে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছে তৃতীয় শ্রেণির শিশু নন্দন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নের দক্ষিণউরা গ্রামে শিক্ষকের পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছেন এক তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রকে। কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না সে। গুরুতর অসুস্থ শিশুপুত্রকে নিয়ে গত পাঁচ মাস ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরার পর মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা পিতা স্কুলের সহকারী শিক্ষক সঞ্জয় সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন।

৩ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় দক্ষিণউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সঞ্জয় সরকারের কাছে প্রশ্ন বুঝিয়ে দিতে বলায় পরীক্ষা চলাকালীন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র নন্দন সরকারকে (৮) বেধড়ক মারধর করেন তিনি। নন্দন দক্ষিণউরা গ্রামের নারায়ণ সরকারের ছেলে।

নন্দনের পরিবারের সদস্যরা জানান, স্থানীয় বিচার-সালিশ ও শিক্ষা বিভাগের ‘আপস-রফার চক্করে’ পড়ে শিশু নন্দনের সহজ-সরল পিতা গুরুতর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় না নিয়ে চিকিৎসক ও প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন। আহত শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি না করে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিছুদিন পর শিশু নন্দন কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। এক পর্যায়ে কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে।

তবে জানাযায়, ধর্মপাশা উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যস্থতায় আহত শিশুর চিকিৎসার ব্যয়ভার অভিযুক্ত শিক্ষক সঞ্জয় সরকার বহন করার কথা থাকলেও একপর্যায়ে এসে দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন তিনি। শেষে গত বুধবার গুরুতর অসুস্থ ছেলেকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন তার বাবা। বিচার চেয়ে সুনামগঞ্জ শিশু আদালতে শিক্ষক সঞ্জয় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত বছরের ৩ আগস্ট ধর্মপাশা উপজেলার দক্ষিণউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র নন্দন সরকার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা দিচ্ছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অংকের প্রশ্ন বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সহকারী শিক্ষক সঞ্জয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাতে কর্ণপাত করেননি ওই শিক্ষক। বিষয়টি অপর এক শিক্ষককে জানালে সঞ্জয় উত্তেজিত হয়ে শিশু নন্দনকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি, লাথি মারতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তার ঘাড়ে সজোরে চেপে ধরে মাটিতে শোয়ানোর চেষ্টা করলে কোমরে গুরুতর আঘাত পায় নন্দন। পরে পিতা এসে তাকে স্কুল থেকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নেত্রকোণা ও ময়মনসিংহে নিয়ে চিকিৎসা করান। সম্প্রতি তার অবস্থার অবনতি হলে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) রফিকুল ইসলাম বলেন, ছাত্র নন্দন সরকার হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। তবে তার চিকিৎসা চলছে।

এদিকে, শিশু নন্দনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার বিষয়টি শুরুতে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মধ্যস্থতায় আপস-রফা হয়। শর্ত মোতাবেক আহত শিশুর সুচিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার অভিযুক্ত শিক্ষক সঞ্জয় সরকার বহন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার অবস্থার অবনতির পর দায় নিতে অস্বীকার করছেন তিনি।

অভিযোগের ব্যাপারে শিক্ষক সঞ্জয় সরকার বলেন, রাগের মাথায় শিক্ষার্থীকে মারার পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় বিষয়টি আপসে মিটমাট হয়ে গেছে। আমি ওই শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা করিয়েছি। সে সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। এখন কী অবস্থায় আছে আমার জানা নেই।

ধর্মপাশা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার পারভীন বলেন, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র নন্দনকে শিক্ষক সঞ্জয় পরীক্ষার হলে থাপ্পড় ও ঘাড় ধরে ধাক্কা দেওয়ার কারণে সে আহত হয়। তার বাবা আমার কাছে একটি আবেদন করেন। আমরা প্রথমে ওই শিক্ষককে আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসা করাতে বলি। সেই মাফিক তার চিকিৎসা হয়। ছেলেটি সুস্থও হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে যে তার অবস্থার অবনতি হয়েছে সেই বিষয়টি শিক্ষার্থীর বাবা আর আমাদেরকে জানাননি।

কমেন্ট