ফসলরক্ষা বাঁধে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা : মাটি কাটা হলো মেশিনে, মাস্টার রোল হচ্ছে শ্রমিক দেখিয়ে

25 total views, 1 views today

নিউজ ডেস্ক:: সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের ৯৬৪টি প্রকল্পের আশি ভাগই এবার এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গত ১৯ জানুয়ারি জোয়ালভাঙ্গা ও হালির হাওরে এক্সেভেটরে বাঁধের কাজ উদ্বোধন করে ওইদিন একাধিক হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেন। এই দুটি বাঁধই শ্রমিকদের দিয়ে (ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে) মাটি কাটার কথা ছিল। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে এবার দুই শতাধিক মেশিনে মাটি কাটা হলেও এখন ফসলরক্ষা বাঁধের পূর্ণ বিল তোলতে মাস্টার রোলে মেশিনের বদলে শ্রমিকের নাম বসিয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করে বিল তোলার প্রস্তুতি চলছে। এইভাবে মাস্টার রোল হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিবে একটি চক্র। এ বিষয়ে শ্রমিকদের বদলে এক্সেভেটর দিয়ে মাটি কাটানোয় সমন্বয়পূর্বক বিল করে দায়দেনা বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ১১ উপজেলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের লিখিত চিঠি দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের সংশোধিত কাবিটা নীতিমালায় নির্ধারিত দূরত্ব থেকে শ্রমিক ও এক্সেভেটর দিয়ে মাটি কাটার জন্য সরকার আলাদা রেট নির্ধারণ করে। কিন্তু কাজের সময় সেটা মানা হয়নি। ফলে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে বরাদ্দ লোপাটের চেষ্টা শুরু থেকেই ছিল। জানা গেছে, ভুয়া মাস্টার রোল দেখিয়ে মোটা অংকের এই টাকা পকেটে ঢুকবে পাউবো’র একটি সিন্ডিকেট, ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রকল্পের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গেলবার সম্পূর্ণ বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে সরকার কাবিটা নীতিমালা-২০১৭ প্রণয়ন করে। এ প্রথায় ঠিকাদারি বাদ দিয়ে হাওরের সুবিধাভোগী কৃষকদের মাধ্যমে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নির্দেশনা ছিল। নতুন নীতিমালায় জেলা প্রশাসককে কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্য সচিব করা হয়।

প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারি প্রকৌশলীকে সদস্যসচিব করে কমিটি করা হয়। কমিটিতে বাঁধ এলাকার জমির মালিক থাকার কথা থাকলেও বেশিরভাগ প্রকল্পেই সেটা মানা হয়নি। এবার ৫২টি হাওরে ৯৬৪টি প্রকল্পের মধ্যে আশি ভাগ প্রকল্পের কাজ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে এবং ২০ ভাগ কাজ মেশিন দিয়ে করানোর প্রাক্কলন ছিল। কিন্তু বাস্তবে ৮০ ভাগ কাজ হয়েছে মেশিনে এবং ২০ ভাগ কাজ শ্রমিক দ্বারা হয়েছে।

প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী প্রায় ১০০ ফুট দূরত্ব থেকে শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটলে প্রতি ঘনমিটার মাটির জন্য প্রায় ১৬৮ টাকা বিল ধরা হয়। অন্যদিকে এক্সেভেটরে কাটা মাটির জন্য ধরা হয়েছে ১১৮ টাকা। নীতিমালায় প্রথম বারের মতো ঘাস লাগানার জন্য প্রতি বর্গ মিটারে প্রায় ২৬ টাকা নির্ধারণসহ কমপেকশন ও ঘাস লাগানোর জন্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোন পিআইসিই নীতিমালা অনুযায়ী পুরো বাঁধে ঘাস লাগায়নি, কমপেকশন করেনি এবং নির্ধারিত দূরত্ব থেকে মাটি কাটেনি। তাছাড়া মওসুমের শুরুতে কয়েকটি হাওরের পানি নিষ্কাশনের জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রত্যক্ষদর্শী কৃষক ও এলাকাবাসী জানান, নানা সমস্যার কারণে শ্রমিকদের বদলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধে মাটি কাটার জন্য এবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ২০০ এক্সেভেটর আনা হয়েছিল। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন এগুলো রটেশন করে প্রতিটি বাঁধে মেশিনে কাজ করেছে। জানা গেছে, সে সময় যেসব বাঁধে মাটি ফেলতে বিলম্ব হয়েছে এক্সেভেটরের কারণে মাটি কাটা যাচ্ছেনা বলে কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সংশ্লিষ্টরা সাংবাদিকদের একাধিকবার অবগত করেছেন। তবে এখন উপজেলা পর্যায়ের পিআইসিগুলো নীতিমালা অনুযায়ী কম্পেকশন ও ঘাস না লাগিয়েই এবং নির্ধারিত দূরত্ব থেকে মাটি না কেটে সেই দূরত্বের রেটেই সম্পূর্ণ বিল তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে. এবার ৭৭৩ কি.মি. বাঁধে সরকার প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ পর্যন্ত বরাদ্দের মধ্যে ১৩৫ কোটি ছাড় দিয়েছে। বকেয়া সম্পূর্ণ বরাদ্দও দেওয়া হবে বলে গত ৩ এপ্রিল সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক মতিবিনিময় সভায় ঘোষণা দিয়ে গেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান। এই সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পাউবো’র প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। মহাপরিচালকের এ ঘোষণাকে ওইদিন হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে নিয়োজিত পিআইসির লোকজন। সভায় দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজী আবুল কালাম যথাযথ মেজারমেন্ট না করে যেন কাউকে অতিরিক্ত বিল না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

জানা গেছে, ফসলরক্ষা বাঁধে নিয়োজিত কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং জেলা কমিটির সদস্যসচিব মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূইয়া গত ১ মার্চ এ কাজের দায়দেনা পরিশোধ বিষয়ে প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কমিটির সভাপতি বরাবর লিখিত চিঠি দেন। এফ-২/৯১৭ স্মারকের ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন- নীতিমালা অনুযায়ী কোথাও কমপেকশন করা হচ্ছেনা এবং এস্কেভেটর দিয়ে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। প্রাক্কলনে শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটার উল্লেখ থাকলেও এক্সেভেটরে মাটি কাটা হচ্ছে বলে তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে সমন্বয়পূর্বক কাজের প্রকৃত দায়দেনা পরিশোধের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের আহ্বান জানানো হলেও এখনো তারা এর কোন উত্তর দেননি। একই বিষয়ে গত ১৫ এপ্রিল জেলা কমিটির সদস্য সচিব আবারও প্রতিটি উপজেলা সভাপতিকে চিঠি দিয়েছেন।

পিআইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য সরকার এবার কাবিটা নীতিমালা পরিবর্তন করলেও নানা সমস্যা ও সংকটের কারণে শ্রমিক দিয়ে বাঁধে মাটি কাটা যায়নি। পানি সম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গত ১৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে এসে জোয়ালভাঙ্গা ও হালির হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ উদ্বোধন করেন। মন্ত্রীর সামনেই এসময় এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে বাঁধে মাটি ফেলা হয়। অথচ এই প্রকল্পটি শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এখন জোয়ালভাঙ্গা ও হালির হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজেরও মাস্টার রোল করা হচ্ছে শ্রমিক দেখিয়ে।

‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন এবার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি ছিল বেশি। ফসলরক্ষা বাঁধের নামে অনেক চেয়ারম্যান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সড়ক নির্মাণ করেছেন। সুনামগঞ্জ সদরে ফসলরক্ষার টাকায় শহর রক্ষা প্রকল্পও বাস্তবায়ন হয়েছে। এ কারণে মন্ত্রণালয় শুরুতে প্রায় শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কেটে দিলেও প্রায় দুই শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন আবার মেশিনের স্থলে মানবশ্রমিক দেখিয়ে মাস্টার রোল করে চূড়ান্ত বিলের প্রস্তুতি নেওয়ায় দুর্নীতির আশঙ্কা করেছে সংগঠনটি।

জোয়ালভাঙ্গা হাওরের পিআইসি’র সদস্য জাহানারা বেগম বলেন, ‘মন্ত্রী সাব আইয়া এক্সাভেটর মেশিন দিয়া আমার বান্দো মাটি ফালাইয়া গেছইন। আমার বান্দো ইবার হকলতার চেয়ে বালা কাজ অইছে। এখন ২-৩শ শ্রমিকের নাম দিয়া আমি মাস্টার রোল কররাম। কিছুদিনের মধ্যেই মাস্টার রোল জমা দিমু। মাস্টার রোল করতে এসও সাবসহ বড় স্যাররাও আমাদের খইছইন।’

জামালগঞ্জের হালির হাওরের ৯২নং পিআইসির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার বাঁধটিতেও মেশিন দিয়ে মাটি কাটিয়েছি। এখন ১৫০ জন শ্রমিকের নামে আমরা মাস্টার রোল প্রস্তুত করছি।

এদিকে মেশিনের বদলে শ্রমিক দেখিয়ে মাস্টার রোল করতে কিছু উপজেলা নির্বাহী অফিসারই আপত্তি জানিয়েছেন। এটা করলে তারা আইনী সমস্যা পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা করছেন। যে কারণে মাস্টার রোল করতে অনেকে বিলম্ব করছেন বলে জানা গেছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা ফসলরক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম বিল্লাহ বলেন, মাস্টার রোল তৈরি করতে এখন সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার এলাকায় প্রায় ১৫-২০ ভাগ হয়েছে শ্রমিক দিয়ে। বাকি কাজ করেছি মেশিনে। এখন বিলের সমন্বয় করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে। তবে কেউ মাস্টার রোল করে যদি অতিরিক্ত বিল নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূইয়া বলেন, আমি এ পর্যন্ত দুটি চিঠিতে সমন্বয় করে বিল জমা দানের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটিকে চিঠি দিয়েছি। কেউ চিঠির উত্তর দেননি। তিনি বলেন, সরেজমিন গিয়ে আমরা দেখেছি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মাটি কাটার কথা থাকলেও সেটা মানা হয়নি। তেমনই কমপেকশনও করা হয়নি। নির্ধারিত দূরত্ব থেকেও মাটি কাটা হয়নি। তিনি বলেন, শ্রমিক দেখিয়ে মাস্টার রোল তৈরি করে বিল উত্তোলন করা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা অপচয় হবে। এ বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •