সাহিত্যে একুশে ও বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পাওয়া বরেণ্য উপন্যাসিক হরিশঙ্কর জলদাসকে নিয়ে সোমবার সিলেটে ‘অন্তরঙ্গ আড্ডা’-এর আয়োজন করা হয়। সোমবার সন্ধ্যায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘অভ্র প্রকাশন’ জিন্দাবাজারে নিজেদের কার্যালয়ে এই আড্ডার আয়োজন করে। এতে সিলেটের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিরা অংশ নেন। এই আড্ডায় নিজের লেখালেখি ও লেখক হয়ে ওঠার গল্প শোনান হরিশঙ্কর।
মৎস্যজীবী পরিবারে জন্ম হরিশঙ্কর জলদাসের। বাবা মাছ বিক্রি করতেন। তিনি নিজেও মাছ বিক্রি করেছেন। বর্ণ বিভাজিত সমাজে মৎস্যজীবীরা নিম্নবর্ণের মানুষ ধরা হয়। এ কারণে সমাজের তথাকথির উচ্চবর্ণের মানুষদের নানা অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাদের। হরিশঙ্কর জলদাসকেও এইসব তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই তাকে লেখক বানিয়েছে।
এমনটি জানিয়ে হরিশঙ্কর বলেন, আমি তথাকথিত ছোটলোকের সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি। এখন পর্যন্ত বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয়েই আছি। আমি ৫৫ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেছি। ৫৫ বছর বয়সে সাধারণত হিন্দুরা গয়া-কাশি যায়, আর মুসলমান মক্কা-মদিনায় যায়। সে বয়সেই আমি কলম ধরেছি। আমি কলম ধরেছি আনন্দে নয়। সবাই মনের আনন্দে লেখেন। আর আমি লিখতে এসেছি অপমানিত হয়ে। আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ আমি কেনো পড়লাম? একটি মৎস্যজীবী ছেলে হয়ে আমি কেন বিসিএস দিয়ে চাকরি করতে এলাম? -এগুলো আমার অপরাধ।
নিজের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে হরিশঙ্কর বলেন, একদিন মাছ বিক্রির সময় আমার বাবা এক সের মাছের দাম তিন টাকা চাওয়ায় এক ক্রেতা আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে তার বগলের ছাতা দিয়ে পিটিয়েছিলো। আমার চোথের সামনেই। আমি তখন ক্লাস নাইনে।
বলতে থাকেন হরিশঙ্কর জলদাস- ‘ক্লাসে সহপাঠিরা আমারে বলতো- জাইল্যা। চাকরিজীবনেও আমাকে ‘জাইল্যার পোলা’ ডাক শুনতে হয়েছে। এই অপমান সইতে সাইতে আমি জেলেজীবন নিয়ে পিএইচডি করি। পিএচডি করার সময় অনেক বই পড়তে পড়তে আমি লেখলেখি শুরু করি।
তিনি বলেন, বড়লোকদের নিয়ে প্রেমের উপন্যাস অনেক লেখা হয়েছে। তথাকথিত ছোটলোকদের নিয়ে কিছুই লেখা হয়নি। আমার ভিশন ছিলো- আমি ছোটলোকদের নিয়ে লিখবো।
লেখক, অধ্যাপক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহর সঞ্চালনায় এই আড্ডায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন অভ্র প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী, লেখক অপূর্ব শর্মা।
চাকরিজীবনের শুরুতে দিনে কলেজে শিক্ষকতা ও রাতে মাছ ধরার কাজ করতেন জানিয়ে হরিশঙ্কর জলদাস বলেন, আমার লেখার বয়স ২০ বছর হয়নি। কিন্তু লিখেছি অনেক। তবে আমার লেখক জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো- কোন প্রেমের উপন্যাস লিখতে পারিনি।
তিনি বলেন, লেখকের চাওয়া আর কিছু না, শুধু পাঠকের ভালোবাসা ও মৃত্যুর পর আরও কিছুটা দিন বেঁচে থাকা।
অন্তরঙ্গ আড্ডায় হরিশঙ্কর জলদাসকে নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও অনুবধাক মিহির কান্তি চৌধুরী। প্রবন্ধে মিরিকান্তি লিখেন- হরিশঙ্করের লেখায় কৃত্রিমতা নেই, আছে জীবনের বাস্তবতা। তিনি সাহিত্যে শুধু বিনোদন দেননি, সমাজের একটি বিশেষ অংশের জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আড্ডায় হরিশঙ্কর জলদাসের সহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল, শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হারুনুর রশীদ, কবি মোস্তাক আহমাদ দীন, বিশ্বনাথ ডিগ্রি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাপসী চক্রবর্তী, সাংস্কৃতিক সংগঠক মনির হেলাল, লেখক-গবেষক সুমনকুমার দাশ, কবি মালেকুল হক, কবি প্রণবকান্তি দেব, কবি সানওয়ারা আক্তার চিনু, কবি রাহানামা সাব্বির চৌধুরী, মিনাক্ষী সাহা, লেখকপত্নী সুনিতা জলদাস, সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরা, লেখক মােহাম্মদ জায়েদ আলী ও কবি মাহিদুল ইসলাম।


