রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে চার জ্যেষ্ঠ নেতার নাম নিয়েই জোর আলোচনা চলছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, দলের প্রতি আনুগত্য এবং সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে এই চারজনের মধ্যে একজনের নাম এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। তিনি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জোরারো আলোচনায় থাকা বাকি তিন জন হলেন— ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। তাদের প্রথম দুজন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। পরের জন স্পীকার ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। এই চারজনই বিএনপিতে পোড় খাওয়া নেতা হিসেবে সমাদৃত। তাদের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল, ড. মোশাররফ, ড. মঈন ও হাফিজ উদ্দিন নিজ নিজ গুণে দেশবাসীর কাছে পরিচিত। শুধু দলের গণ্ডির মধ্যেই সমাদৃত নন; বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ব্যক্তিত্ব, সদাচার, মার্জিত আচরণ, অহিংস, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অগ্রসেনানী ও দেশপ্রেমিক হিসেবে তাদের আলাদা কদর আছে।
বিএনপির পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে কার কী অবদান, তা নিয়ে চলছে মূল্যায়নও। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব মূল্যায়ন বিবেচনায় নিয়েই রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়ন ঠিক করবেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান। ফলে সবার নজর এখন তারেক রহমানের দিকে। ১ আগস্ট বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতির নাম চূড়ান্ত করার দায়িত্ব চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর দিয়েছেন দলটির নেতারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন রাজনীতির পাশাপাশি একজন ভূতত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক হিসাবেও পরিচিত। ১৯৭৯ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সারা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং বিএনপির প্রথম ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার সংসদ-সদস্য এবং তিনবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে। দল পুনর্গঠন ও সংকটের সময় তার অবদান অনস্বীকার্র্য। প্রবীণ এই নেতা সংকটকালে কখনো দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এবং ওয়ান-ইলেভেনসহ বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে ছিলেন। হাসিনা সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয়।
রাজনীতির বাইরেও তার রয়েছে সমৃদ্ধ একাডেমিক জীবন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে আরেকটি ডিগ্রি নেন। ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্বে পিএইচডি এবং ১৯৭৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে ডিআইসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে জুনিয়র লেকচারার হিসাবে শিক্ষকতা শুরু করে সহকারী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে তিনি প্রবাসীদের সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসাবেও নেতৃত্ব দেন।
২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। দলের প্রবীণ নেতা হিসাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ফলে দলের ভেতরে ও বাইরে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এই নেতার নাম রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় আসা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। তবে বর্তমানে শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থতা থাকার কারণে তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নানা দিক থেকে চিন্তা করতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় ও আন্দোলনে তার ভূমিকা সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের কঠিন সময়ে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তার সক্রিয় ভূমিকার কথা সর্বস্তরে প্রশংসিত। মহাসচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করে দলের ভেতরে-বাইরে সমান গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন তিনি।
একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসাবেও মির্জা ফখরুলের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গেও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক আলোচনায় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ারও অত্যন্ত পছন্দ ও স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
তিনবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপির এই মহাসচিব বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। নানা প্রোপাগান্ডায় এক-এগারোর আগে ও পরে বিএনপি কিছুটা ভাবমূর্তির সংকটে পড়লে স্বচ্ছ ইমেজের নেতা হিসাবে মির্জা ফখরুলকে সামনে আনা হয়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী দলের মুখপাত্র হিসাবে গণমাধ্যমে তার পরিচিতি আরও বাড়ে।
২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলাওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে তার বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে এবং ১১ বার তিনি কারাবরণ করেছেন। হাসিনা সরকার দল ভাঙতে মির্জা ফখরুলকে চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নানা প্রলোভনও দিয়েছেন বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে। কিন্তু তাকে টলাতে পারেননি। অনেকের মতে, নির্লোভ ফখরুল দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তারেক রহমান লন্ডনে এবং বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকার সময় দেশে দল ও আন্দোলনের দৃশ্যমান নেতৃত্বের অন্যতম মুখ ছিলেন মির্জা ফখরুল। এসব কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তার নামই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
এ দুজনের বাইরে ড. আবদুল মঈন খানের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির পাশাপাশি দেশ-বিদেশে তার রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও একাডেমিক পরিচিতি। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অত্যন্ত পছন্দের লোক হিসাবে পরিচিত তিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তার বাসায় প্রায় বিদেশি কূটনীতিকরা বৈঠকে বসতেন। একজন সৎ ও সজ্জন ব্যক্তি হিসাবেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার সুনাম রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী ছাত্র ড. খান একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার ও ফেলোশিপও পেয়েছেন।
ইংল্যান্ডে পিএইচডি গবেষণার সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বৃত্তি ও নাগরিকত্ব বাতিল করে। পরে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তির সহায়তায় তিনি উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পান। রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার সংসদ-সদস্য এবং তিনবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।
বিএনপির আন্দোলনের সময় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল। দীর্ঘদিন দলের প্রতি আনুগত্য ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে অন্যতম দাবিদার হিসাবে তার নামও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের কর্মময় জীবন যেন সাফল্যের এক বিশাল ক্যানভাস। তিনি একাধারে ফিফা-স্বীকৃত ফুটবলার, বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, সাতবারের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবং একাধিকবারের অভিজ্ঞ মন্ত্রী।
ছয় দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি রাজনীতি, সামরিক বাহিনী, ক্রীড়া ও জনপ্রশাসনে গুরুপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সর্বশেষ তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় নানা চাপ ও প্রলোভন সত্ত্বেও শেষ পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমে সংসদ-সদস্য পদে মনোনয়ন, পরে মন্ত্রী এবং সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। অনেকের মতে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে সংসদের স্পিকার হিসাবে হাফিজ উদ্দিনকে বেছে নিয়েছেন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকায় রাষ্ট্রপতি হিসাবে তার নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, রাষ্ট্রের মর্যাদা যেন দেশে এবং বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারেন-এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত হবে। এখানে বিএনপিকেই চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপির যে চিন্তা, আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী যে কমিটমেন্ট করে ক্ষমতায় এসেছেন, সেগুলোকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কার্যালয়েরও একটা সহযোগিতা তারেক রহমানের লাগবে। তাছাড়া যিনি জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবেন, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া উচিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, আলোচনায় থাকা সবারই অবদান রয়েছে। প্রত্যেক মানুষই একজন আরেকজন থেকে আলাদা। তাদের চিন্তাচেতনা, মূল্যবোধ, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাদীক্ষা-সবদিক থেকেই ভিন্ন। তাই ব্যক্তির মধ্যে তুলনা করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, আলোচনায় থাকা চারজনের প্রত্যেকেই অভিজ্ঞ, যোগ্য, উচ্চশিক্ষিত এবং তাদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা আছে। আমি যতটুকু শুনেছি, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার সর্বোচ্চ বিবেচনা শক্তি ব্যবহার করে তাদের মধ্য থেকেই বেছে নিয়ে একজনের নাম রাষ্ট্রপতি পদে চূড়ান্ত করবেন।


