কার্যক্রম শুরুর মাত্র তিন বছর না পেরোতেই অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে ‘সর্বজনীন পেনশন’ কার্যক্রম। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
সাত কোটি গ্রাহকের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত নিবন্ধনকারীর সংখ্যা চার লাখেরও কম।
শুরু থেকেই আস্থাহীনতা, বিতর্ক এবং নানা গোষ্ঠির আপত্তির কারণে বাঁধার মুখে পড়া এই উদ্যোগ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর চূড়ান্ত সংকটে রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই কর্মসূচি থাকবে কিনা, জমা হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা এমন নানা অনিশ্চয়তার কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছায়নি নিবন্ধনকারীর সংখ্যা। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে অর্থ জমা দেওয়াও বন্ধ রেখেছেন পুরনো নিবন্ধনকারীদের অনেকে।
শুরুর দিকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হলেও একপর্যায়ে মাসিক কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেন বেসরকারি চাকরিজীবী মাজহারুল ইসলাম।
‘ব্যাংকের দুর্দশার গল্প প্রতিদিন শুনি, সব টাকা নাকি গায়েব- ভবিষ্যতের কথা ভেবে শুরুতে যুক্ত হয়েছিলাম কিন্তু রাজনীতি নিয়ে যত নাটকীয়তা শুরু হলো তাতে আর ভরসা পাইনি,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
তার মতো অনেকেই পেনশন স্কিমে অর্থ জমা দেওয়া আপাতত বন্ধ রেখেছেন। তবে শঙ্কা নিয়েও কিস্তি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ।
‘একদম শুরু থেকে মাসিক টাকা জমা দিচ্ছি, এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হইনি। সরকার পরিবর্তনের পর কী হবে এটা নিয়ে একটু উৎকণ্ঠা ছিল। এই সরকার কার্যক্রমটি চালিয়ে নেবে, আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই,’ বলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরেফিন শাকিল।
সম্প্রতি এই কার্যক্রম নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা এসেছে। যদিও অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা বলছেন, সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে না পারলে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।
পেনশন কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের অগাস্টে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম যখন শুরু হয় তখন এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে কর্মরতদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল সরকারের এই কর্মসূচি।
তবে অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক লেনদেনের নানা বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ায় এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ কখনই দেখা যায়নি।
একপর্যায়ে সরকারি চাকরিজীবীদের যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রেখে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে একটি স্কিম চালু করার পর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামতেও দেখা গেছে অনেককে।
ওই সময় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কর্মবিরতিও ঘোষণা করেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই কার্যক্রম সচল থাকলেও এর অগ্রগতি ছিল সামান্যই।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৫ জন এই কার্যক্রমে নিবন্ধন করেছেন।
এই সময়ে প্রায় ২৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা সর্বজনীন পেনশন ফান্ডে জমা হয়েছে। আর লভ্যাংশসহ মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৭৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর সামাজিক এবং আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে নেওয়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই পরিকল্পনা আসলে কতটা এগিয়েছে এই সংখ্যায় তার ইঙ্গিত দেয়।
এমন প্রেক্ষাপটে, নতুন সরকার এই কার্যক্রম এগিয়ে নেবে কিনা এমন প্রশ্নই ঘুরেফিরে সামনে আসছে।
সম্প্রতি এ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে সরকার। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষকে এই কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও জনপ্রিয় করে তুলতে সব ধরনের কার্যক্রম হাতে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য শেখ কামরুল হাসান বলছেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
‘২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন করে সদস্যকে এই পেনশনের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে,’ বলে বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়।
এছাড়া নতুন পেনশন স্কিম চালু, নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশনের ব্যবস্থা এবং সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
ঋণ নিচ্ছে পেনশন কর্তৃপক্ষ
সর্বজনীন পেনশন নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই সম্প্রতি এই কার্যক্রম চাঙ্গা করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি এর কাছ থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত বেশ কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পেনশন ব্যবস্থার প্রশাসনিক আধুনিকায়ন, আইটি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং এই বিশাল তহবিল পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যেই এই অর্থ ব্যয় হবে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য শেখ কামরুল হাসান বলছেন, অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সেবার পরিধি বাড়াতে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
এছাড়া এই ফান্ডে জমা হওয়া অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরামর্শক নিয়োগ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যও এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে চায় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
‘আমাদের কিছু বিষয়ে কনসালটেন্ট দরকার, আমরা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বন্ডে বিনিয়োগ করছি কিন্তু একমাত্র বন্ডে বিনিয়োগ করাই তো লাভজনক নয়। এই বিষয়গুলোও একজন ভালো কনসালটেন্টের মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো, এখানেও অর্থ প্রয়োজন।’
তবে এই ঋণ কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন বা প্রচারণায় ব্যয় করা হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে বোঝা হতে পারে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।
তারা বলছেন, ভারত এবং চীনের মতো বিশ্বের অনেক দেশই পেনশন কার্যক্রমে বিদেশি সহায়তা নিয়ে পেনশন ফান্ড ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।
অন্যদিকে চিলির মতো অনেক দেশ এই কার্যক্রমকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দিয়ে বিপাকে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ মানুষের টাকা যেন নিরাপদ এবং লাভজনক খাতে বিনিয়োগ হয়।
‘ঋণের ধরন বা মডেলটা কিভাবে ভাবা হচ্ছে সেটি বিস্তারিত না জেনে বলা কঠিন। তবে পেনশন কর্তৃপক্ষে কারা থাকবেন, ওই মানুষগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন কিনা এই বিষয়গুলোই বেশি জরুরি,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
আস্থা ফেরানোই মূল চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি মানুষের সংখ্যা ১১ কোটিরও বেশি। এই মানুষগুলোই মূলত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত।
বিশাল এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে পেনশন কার্যক্রমের চারটি স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম।
যেখানে আস্থার সংকটই শুরু থেকে মূল সমস্যা হিসেবে সামনে আসছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমের সফলতা এবং ব্যর্থতার বিষয়টি সাধারণ মানুষের আস্থার ওপরই নির্ভর করছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল হক।
তিনি বলছেন, রাষ্ট্র যদি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই কর্মসূচি হিসেবে সফল হবে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকাও জরুরি বলে মনে করেন হক।
‘পেনশন ফান্ডের টাকা কি সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে খরচ করবে নাকি লাভজনক কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ফলাফল একই হবে,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এই কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে প্রশ্ন বা উদ্বেগ রয়েছে সেটি ঠিক করার পরামর্শ সিপিডি এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, ‘অতীতে সব কিছু যেভাবে দলীয়করণের মধ্যে চলে গিয়েছিল তখন এটা যে একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে এবং টিকে থাকবে- সেটার ওপরই মানুষের বিশ্বাস ছিল না।’
মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম সফল করতে হলে বিনিয়োগ, অর্থ লেনদেনসহ সব ক্ষেত্রে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।
‘মানুষ টাকা রেখে ফেরত পাবেন, এই নিশ্চয়তা জরুরি। পেনশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে যারা থাকবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা, তাদের কাজ করার স্বাধীনতা- এগুলো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন তিনি।


