হরমুজে কী পরিণতি হবে লোহিত সাগরে নাকানিচুবানি খাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জ্বালানি পরিবহণের জন্য হরমুজ প্রণালিকে সুরক্ষিত করার পথ খুঁজছে পশ্চিমা মিত্ররা। তবে তাদের সামনে এক রূঢ় বাস্তবতা: কয়েক বছর আগে লোহিত সাগরে শুরু করা একই ধরনের প্রচেষ্টায় শত শত কোটি ডলার খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে তা ব্যর্থ হয়েছে।

লোহিত সাগরের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা—চারটি জাহাজ ডুবি, ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র ব্যয় এবং এমন একটি পথ যা জাহাজ শিল্প এখনও এড়িয়ে চলে—এখন হরমুজ প্রণালির ওপর কালো ছায়া ফেলছে। বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। বর্তমানে এটি ইরানের মাধ্যমে অবরুদ্ধ, যারা হুথিদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।

 

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হুমকি এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে তাদের হামলা তেলের দাম আকাশচুম্বী করে দিয়েছে, যা ইতিহাসে তেল ও গ্যাস সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। প্রণালিটি পুনরায় খুলে না দিলে ঘাটতি আরও তীব্র হবে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে।

কুয়েত পেট্রোলিয়ামের সিইও শেখ নওয়াফ সৌদ আল-সাবাহ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) হিউস্টনে অনুষ্ঠিত সিইআরএ-উইক জ্বালানি সম্মেলনে ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক আইন এবং বাস্তবতার নিরিখে এটি বিশ্বের প্রণালি।’

মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা প্রণালিটি রক্ষার জন্য প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাহরাইনের মতো কিছু দেশ কঠোর অবস্থান নিয়ে ‘প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা’ (যার অর্থ সামরিক শক্তিও হতে পারে) নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ১৯ জন নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যারা এই প্রণালি রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে থাকা অসংখ্য চ্যালেঞ্জ বর্ণনা করেছেন। হুথিদের তুলনায় ইরানের সামরিক বাহিনী অনেক বেশি উন্নত। তাদের কাছে সস্তা ড্রোন, ভাসমান মাইন ও মিসাইলের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে এবং খাড়া পাহাড়ি উপকূল থেকে সরু এই জলপথে তাদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সহজ।

১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মার্কিন ট্যাঙ্কার এসকর্ট অপারেশনে যুক্ত থাকা অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে কনভয় রক্ষা করা লোহিত সাগরের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।’

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় উদ্বেগ, কারণ মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত মার্কিন ভোটাররা এখন প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ৪ ডলারের কাছাকাছি দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথটি না খোলা পর্যন্ত জ্বালানির দাম পুরোপুরি কমবে না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ দিয়ে বেশিরভাগ জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি ইরান এই প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনা করছে।

হরমুজ সংকট

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লোহিত সাগরে হুথিদের হাত থেকে জাহাজ রক্ষা করতে মার্কিন মিশন শুরু হয়, যাতে পরে ইউরোপীয় দেশগুলোও যোগ দেয়। মিত্ররা শত শত ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করলেও ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হুথিরা চারটি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এখন জাহাজগুলো এই পথ এড়িয়ে আফ্রিকার ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে।

গবেষণা সংস্থা সিএনএ-এর নৌ বিশ্লেষক জশুয়া ট্যালিস বলেন, এটি ছিল কৌশলগত ও কার্যক্ষম দিক থেকে একটি বিজয়, কিন্তু সামগ্রিক বিচারে এটি একটি কৌশলগত ড্রয় বা হার।

হরমুজ প্রণালির চারপাশের বিপদ অঞ্চল লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালির তুলনায় পাঁচ গুণ বড়। হুথিদের মতো নয়, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একটি পেশাদার বাহিনী যাদের নিজস্ব অস্ত্র কারখানা ও অর্থায়ন রয়েছে।

কিছু সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে, এখানে সুরক্ষা দিতে ডজনখানেক বড় যুদ্ধজাহাজ (ডেস্ট্রয়ার), জেটস, ড্রোন ও হেলিকপ্টার প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের উপকূলরেখা জাহাজের এত কাছে যে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে ড্রোনের ঝাঁক আক্রমণ করতে পারে। ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ অন দ্য মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকার পরিচালক আদেল বাকাওয়ান বলেন, সেখানে ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন, ভাসমান মাইন আছে এবং এমনকি আপনি যদি এগুলো ধ্বংসও করতে পারেন, তবুও সেখানে আত্মঘাতী হামলার ভয় থাকে।

অবসরপ্রাপ্ত রয়্যাল নেভি কমান্ডার টম শার্প বলেন, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে সমুদ্রের মাইন বা সশস্ত্র ছোট সাবমেরিনের মুখোমুখি হতে হয়নি। যদি এই অভিযানে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারও হারায়, তবে পুরো হিসাব বদলে যাবে। একটি ডেস্ট্রয়ারে ৩০০ মানুষ থাকে।

যদিও ইরান প্রণালিতে মাইন পেতেছে কিনা তার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে হাডসন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ক্লার্কের মতে, মাইন পরিষ্কার, সামরিক এসকর্ট এবং আকাশপথে টহল দেওয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত যাতায়াত শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে আইআরজিসির হুমকি পুরোপুরি নির্মূল করতে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *