ভোটকেন্দ্র দখল ও ভোট কেনার প্রস্তুতির অভিযোগ সিলেট বিএনপির

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটে একটি স্বাধীনতাবিরোধী ও অশুভ চক্র পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি, প্রকাশ্যে ভোট কেনা, ধর্মীয় প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায় এবং নির্বাচন কমিশনের গোপনীয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা অবৈধভাবে ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছে দলটি।
আজ শনিবার সিলেট-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর বিএনপির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলছে, ঠিক তখনই একটি পরাজয় নিশ্চিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশব্যাপী অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ওই গোষ্ঠীটি সিলেটের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বক্তব্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি আঘাত।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক দল কোমলমতি শিশু-কিশোর ও নারীদের টার্গেট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে প্রকাশ্য জনসভায় ধর্মকে ব্যবহার করে ‘বেহেশতের প্রলোভন’ দেখিয়ে ভোট প্রার্থনা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতারা জানান, নগরী ও সদর উপজেলার একাধিক ভোটকেন্দ্রে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল কেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। যেসব কেন্দ্রে বেআইনি প্রভাব বিস্তার, সশস্ত্র মহড়া বা সহিংসতার মাধ্যমে ভোট প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ভোটের আগে ও পরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ওই কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের জন্য জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিএনপির অভিযোগ, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ব্যাপকভাবে টাকা দিয়ে ভোট কিনছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে এমন প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিষয়টি প্রমাণসহ সিলেটের স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এ ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তোলা হয়। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত তিনটিতে বহিরাগত মানুষের আনাগোনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে বলে বিএনপি নেতারা দাবি করেন। এসব বহিরাগত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও গুরুতর অভিযোগ করে বলা হয়, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকরা নির্বাচন কমিশনের গোপনীয় ও সংরক্ষিত ‘ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা’ অবৈধভাবে সংগ্রহ করেছেন। তারা ওই তালিকা নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন এবং ভোটারদের মাঝে তা বিতরণ করছেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা শুধুমাত্র নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। কোনো প্রার্থী বা তাদের সমর্থকদের ব্যক্তিগতভাবে এ তালিকা সংরক্ষণ, ফটোকপি বা বিতরণের কোনো আইনগত অধিকার নেই।
বিএনপি নেতারা বলেন, এভাবে ভোটারদের ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছবিযুক্ত তালিকা প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোটারদের ওপর এক ধরনের প্রচ্ছন্ন মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সরকারি নথি অবৈধভাবে ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে অবিলম্বে এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। যারা ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা সরবরাহ ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রতিটি ভোটারের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
বিএনপি নেতারা বলেন, তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান। তবে নির্বাচনী আচরণবিধির এমন নগ্ন লঙ্ঘন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এবং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, মহানগর বিএনপির সাবেক আহবায়ক আব্দুল কাইয়ুম জালালি পংকি, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি মাহবুব কাদির শাহি, সৈয়দ সিসবাহ উদ্দিন, নুরুল মোমিন চৌধুরী খোকন, আব্দুর রহিম মল্লিক, মহানগর যুগ্ম সম্পাদক নজিবুর রহমান নজিব, জেলা যুগ্ম সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান পাপলু, মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নুরুল আলম সিদ্দিকী খালেদ, মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল ওয়াহিদ সুহেল ও নাদির খান, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কোহিনুর আহমদ এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক আব্দুল আহাদ খান জামালসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *