জাওয়াহিরিকে যেভাবে খুঁজে বের করে হত্যা করে সিআইএ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: আফগানিস্তানের কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় আল কায়েদার প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহত হয়েছেন। রোববার ড্রোনের মাধ্যমে ওই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে চালানো একটি অভিযান সফল হয়েছে। ওই অভিযানের বিষয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিস্তারিত জানাবেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, জাওয়াহিরি অনেক বছর ধরে লুকিয়ে ছিল এবং তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করার ঘটনাটি কাউন্টার-টেররিজম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘সতর্ক, ধৈর্য্যশীল এবং অবিচল’ কাজের ফল।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা কাবুলের ওই অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত অনেক তথ্য দিয়েছেন।

তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি নেটওয়ার্কের বিষয়ে সজাগ ছিল আর তাদের মূল্যায়ন ছিল, সেটি জাওয়াহিরিকে আশ্রয় দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সরে আসার পর গত এক বছর ধরে আফগানিস্তানে আল কায়েদার উপস্থিতির ইঙ্গিতগুলোর ওপর নজর রাখছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

চলতি বছর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জাওয়াহিরির পরিবারকে শনাক্ত করে। এদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রী, তার কন্যা ও ওই নারীর সন্তানরা। তাদের কাবুলের একটি নিরাপদ বাড়িতে রাখা হয়েছিল। পরে ওই একই বাড়িতে জাওয়াহিরির উপস্থিতিও শনাক্ত হয়।

কয়েক মাসের মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও নিশ্চিত হয়ে ওঠেন যে তারা কাবুলের ওই নিরাপদ বাড়িতে জাওয়াহিরিকে সঠিকভাবেই শনাক্ত করেছেন। এপ্রিলের প্রথমদিকে তারা মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাতে শুরু করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলেভান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিষয়টি জানান।

মার্কিন কর্মকর্তারা জাওয়াহিরি যেখানে অবস্থান করতেন সেই নিরাপদ বাড়ির একটি স্কেল মডেল তৈরি করেন। পরে সেটি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দেখাতে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেওয়া হয়। তারা জানত যে জাওয়াহিরি বাড়ির ব্যালকনিতে বসে থাকতেন।

ওই ভবনের কাঠামোর জন্য কোনো হুমকি তৈরি না করে এবং বেসামরিক ও জাওয়াহিরির পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি সর্বনিম্ন রেখে কীভাবে জাওয়াহিরিকে হত্যা করতে অভিযান চালানো যায় তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ওই নিরাপদ আস্তানার গঠন ও ধরন অনুসন্ধান করার পাশাপাশি এর বাসিন্দাদের যাচাই করে দেখেন বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

পরের সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন গোয়েন্দা তথ্যগুলো যাচাই ও পদক্ষেপ নেওয়ার সেরা উপায় নিয়ে আলাপ করতে প্রধান উপদেষ্টাদের ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১ জুলাই হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে সিআইএ-র পরিচালক উইলিয়াম বার্নসসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রস্তাবিত একটি অভিযানের বিষয়ে বাইডেনকে অবহিত করেন।

ওই বৈঠকে বাইডেন বহু প্রশ্ন করেন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা ওই নিরাপদ আস্তানার একটি মডেল নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখেন। তিনি আলো, আবহাওয়া, নির্মাণ উপকরণসহ যে যে বিষয়গুলো অভিযানের সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কাবুলে হামলা চালালে সম্ভাব্য যে প্রভাব সৃষ্টি হবে বাইডেন তাও বিশ্লেষণ করে দেখার অনুরোধ করেছিলেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট বাইডেন চূড়ান্ত ব্রিফিংয়ের জন্য মন্ত্রিসভার প্রধান সদস্যদের ও উপদেষ্টাদের ডাকেন এবং জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হলে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা নিয়ে আলোচনা করেন।

ওই রুমে থাকা অন্যান্যদের মতামত নেওয়ার পর বাইডেন বেসামরিকদের নিহত হওয়ার ঝুঁকি সর্বনিম্নে রাখার শর্তে ‘এটি সুনির্দিষ্ট উপযোগী বিমান হামলার’ অনুমোদন দেন।

রোববার সূর্যোদয়ের সময় জাওয়াহিরি আফগানিস্তানের কাবুলের একটি বাড়ির ব্যালকনিতে আসেন এবং সেখানে অবস্থান করেছিলেন। যেমনটি মার্কিন গোয়েন্দারা তাদের পরিকল্পনায় উল্লেখ করেছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন- এ দিন একটি মার্কিন ড্রোন আল-কায়েদা নেতাকে লক্ষ্য করে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ওই হামলায় ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে থাকা জাওয়াহিরি নিহত হন।

আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন এবং আল-জাওয়াহিরি একসঙ্গে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার আয়োজন করেন বলে অনেকে অভিহিত করেন। আল-জাওয়াহিরি মিসরের ইসলামি জিহাদ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালের মে মাসে মার্কিন বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পর আল-জাওয়াহিরি আল কায়েদার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.