চট্টগ্রামে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা

নিউজ ডেস্ক:: এক রাতের মুষলধারারে বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম নগরী। স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাসাবাড়ি, থানা ভবন, মেয়রের বাড়ি, হাসপাতাল, খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই থেকে শুরু করে এমন কোনো নিম্ন এলাকা নেই যেখানে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে যায়নি।

কেবল নিম্নাঞ্চল নয়; চট্টগ্রামের প্রধান সড়কের ওপর দিয়েও রোববার রাতভর প্রবাহিত হয়েছে পানি। বিসিক কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকাও তলিয়ে যায়। বাসাবাড়িতে পানি ঢোকার কারণে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে বাসিন্দাদের।

রোববার রাতে বৃষ্টি হলেও সোমবার বিকাল পর্যন্ত অনেক এলাকা থেকে পানি নামেনি। চারদিকে পানি থই থই করায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মজীবীদের ফেরত আসতে হয় মাঝপথ থেকে।

এদিকে, পানি থেকে আইপিএস বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন দুজন। চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ কাতালগঞ্জ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন আবু তাহের (৬৫) ও গাড়ি চালক মো. আবুল হোসেন (৩৮)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকার অন্তত ৫টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে চলছে এসব প্রকল্পের কাজ।

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলার কারণে প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা থেকে ধীরে ধীরে নগরবাসী মুক্ত হওয়া তথা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও এখন হচ্ছে উলটো।

অর্থাৎ প্রতিবছরই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে জলাবদ্ধতা নিসরন প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকার আদৌ সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি না।

সর্বশেষ রোববার ঢাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা দিন দিন বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ জলাবদ্ধতা প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মুরাদপুর-প্রধান সড়ক ও ফ্লাইওভারের চিত্র : রোববার রাত ৯টা। নগরীর মুরদাপুর মোড়ে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নিচে হাঁটু থেকে কোমর পানি। খাল-নালা উপচে প্রচণ্ড স্রোত বইছিল সড়কে।

এতে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। পানির কারণে এক হাত সামনের দিকেও চলতে পারছিল না গাড়ি। এলোমেলোভাবে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা রাস্তার ওপর পড়ে থাকায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরমুখো মানুষ কোমর পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কেউ কেউ বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করছিলেন, কখন কমবে পানি, চালু হবে গণপরিবহণ, সেই আশায়।

ফ্লাইওভারের এক প্রান্ত বহদ্দারহাট ও অপর প্রান্ত লালখানবাজার এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ফ্লাইওভারের ওপরে দেখা দেয় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট।

সড়কের লোকজন পানি মাড়িয়ে হেঁটে চলাচল করতে পারলেও ফ্লাইওভারে আটকেপড়া লোকজন কোনো দিকেই যেতে পারছিলেন না। ভোর ৬ টার দিকে মুরাদপুর মোড়ের পানি নেমে গেলে বিভীষিকাময় এক রাত শেষে স্বাভাবিক হতে থাকে জীবনযাত্রা।

বহদ্দারহাট থেকে শুরু করে নগরীর আগ্রাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নগরীর প্রধান সড়কটির পুরোটাই পানিতে প্লাবতি হয়। তাই মুরাদপুরের মতো রাতভর একই চিত্র দেখা যায় ষোলশহর দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড় এলাকায়।

পানিতে তলিয়ে ছিল মেয়রের বাসভবন : নগরীর বহদ্দারহাটের বহাদ্দার বাড়িতে অবস্থিত চট্টগ্রাম সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবন। সোমবার সকালে মেয়রের বাসভবনে গিয়ে দেখা গেছে, বৈঠক খানায় ঢুকে পড়েছে হাঁটুপানি।

ভিজে গেছে আসবাবপত্র। উঠোনে ও মেয়রের বাসভবনের সামনের গলিতে ছিল কোমর পানি। বহদ্দারহাট, বাকলিয়া খাজা রোড এলাকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বাতিল করা হয় ক্লাস পরীক্ষা।

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ২ জনের মৃত্যু : নগরীর একটি বাড়ির নিচতলায় পানি উঠে ২ জন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে পাঁচলাইশ থানার কাতালগঞ্জ আবদুল্লাহ খান লেনের খান বাড়ির নিচতলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত দুজন হলেন, ওই বাড়ির কেয়ারটেকার আবু তাহের (৬৫) ও গাড়ি চালক মো. আবুল হোসেন (৩৮)।

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অনেক এলাকা : রোববার রাতের ভারি বর্ষণে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পানি নেমে যাওয়ার পর ওই সব এলাকায় বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।

এ সময় কোনো কোনো এলাকা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন ছিল। নগরীর হালিশহর থানাধীন শান্তিবাগ, ‘কে’ ব্লক, ‘এল’ ব্লক ও ‘আই’ ব্লকসহ বিভিন্ন এলাকায় সোমবার দুপুর পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না।

নগরীর ‘কে’ ব্লকের বাসিন্দা ম. মাহমুদুর রহমান শাওন বলেন, কোনো কোনো বাসা নিচু হওয়ায় বৈদ্যুতিক মিটার পানিতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। এরপর রাত ৩টায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রামপুর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈকত কান্তি দে বলেন, পানি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন বাসা-বাড়ির বৈদ্যুতিক মিটার ডুবে যাওয়ার অবস্থা হয়, গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়ে সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পানি নেমে যাওয়া শুরু হলে পর্যায়ক্রমে সংযোগ দেওয়া হয়।

আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসাতাল এবং সিডিএ আবাসিক এলাকা : চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির সীমা ছিল না।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিচ তলায় শিশু ওয়ার্ড, অভ্যর্থনা কক্ষ, বহির্বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ ও ক্যানসার ইউনিট রয়েছে। জলাবদ্ধতার পর এসব সেবা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলেও, রোগী, স্বজন ও চিকিৎসকদের চলাচলের সমস্যা হচ্ছে।

আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সোসাইটির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, আবাসিক এলাকার পাঁচ শতাধিক বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও সিডিএ এলাকায় ও সরকারি-বেসরকার  গুরুত্বপূর্ণ অফিস রয়েছে।

যেগুলো পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া দেওয়ান বাজার খলিফাপট্টি, বাকলিয়ার কে বি আমান আলী রোড ফুলতলা, ডিসি রোড, বড় মিয়া মসজিদ, ডিসি রোড, নুর বেগম মসজিদ এলাকাসহ আশপাশের এলাকা পানিতে তলিয়ে ছিল।

আরও কয়েকটি এলাকার জলাবদ্ধতার চিত্র : নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা কাজল সেন বলেন, রোববার রাত ৩টার সময় তার বাসায় পানি ঢুকা শুরু হয়। এক ঘন্টার ব্যবধানে নিচতলা হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়।

আসবাবপত্র ভিজে যায়। পানিতে তলিয়ে যায় খাট। একই অবস্থা বাকলিয়া এলাকার ডিসি রোডের বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম হিরণ, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও মোহাম্মদ আলমগীরের বাসার। তাদের বাসা বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে।

সৈয়দ শাহ রোডের বাসিন্দা সরওয়ার কামাল বলেন, দুদিন ধরে পানিবন্দি। এত পানি বিগত ১০ বছরেও দেখিনি। জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। ভেবেছিলাম দিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এখন দেখি উলটো অবনতি হচ্ছে।

চসিক মেয়রের জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন : চসিক মেয়র রেজাউল করিম সোমবার চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা ও পূর্বষোলশহর ওয়ার্ডের বহদ্দারহাট পর্যন্ত পায়ে হেঁটে ভারী বর্ষণে জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্য বিতরণ করেন।

জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ মোকাবিলায় চসিকের পক্ষ থেকে বাটালিহিলস্থ অস্থায়ী নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মেয়র।

মেয়র রেজাউল বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে এক সময় ৭৬টি খাল ছিল। এখন আছে ৫৭টি। অনেক খাল ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। সেই খালগুলো উদ্ধার করা দরকার।

কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.