হবিগঞ্জের বাহুবলে জুনায়েদ হত্যায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা…

41 total views, 2 views today

আজিজুল ইসলাম সজীব:: হবিগঞ্জের বাহুবলে গ্রাম্য মাতব্বরদের পঞ্চায়েতির দ্বন্দ্বের জের ধরে জুনায়েদ হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রামের ৪ মাতব্বরসহ ৩৮ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত রাখা হয়েছে অারো ৮/১০জনকে। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় নিহতের বড়ভাই শিব্বির আহমদ বাদী হয়ে নবীগঞ্জ থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন।

নিহত জুনায়েদ মিয়া (৩২) বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের আব্দুল আউয়াল ওরফে উচা মিয়ার ছেলে। সে কেমিস্ট ল্যাবরেটরিজ কোম্পানীতে রিপ্রেজেনন্টেটিভ হিসাবে নবীগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করে আসছিল।

এ ঘটনায় পুলিশ শনিবার ভোরররাতে অভিযান চালিয়ে তিনজকে আটক করে। পরে তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
আটককৃতরা হলেন বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের শামছুল ইসলাম ওরফে কাঁচা মিয়া, একই গ্রামের নুরুজ মিয়ার পুত্র রায়হান ও আহমদ আলী।

উল্লেখ্য , শুক্রবার সন্ধ্যায় বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের পঞ্চায়েতি বিরোধের জের ধরে বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া (নবীগঞ্জের রইচগঞ্জ) বাজারে জুনাইদে কুপিয়ে হত্যা করে মাতব্বর শওকত গ্রুপের লোকজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো অর্ধশতাধিক লোকজন।

তাৎক্ষনিক তাকে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নেয়ার পথে রাত ৮টায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

নবীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম আতাউর রহমান বলেন, মামলার সম্পর্কে কিছু বলা যাবেনা। বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, খাগাউড়া গ্রামের চার মাতব্বরদের মধ্যে গেদা মিয়াকে প্রধান অাসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ২৬/১৮।

এছাড়াও মামলায় ২ নং অাসামী শওকত মিয়া, সেগেন ও শহিদ মিয়াসহ ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলাটি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মামলা রেকর্ড করেন থানার ওসি।

খাগাউড়া গ্রামের চার মাতব্বরের কু-কৃর্তি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে জানা যায়, হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার শেষ সীমান্তে অবস্থিত খাগাউড়া গ্রামটি। এ গ্রামে প্রায় দেড় হাজার মানুষের বসবাস। উপজেলার ভাটি অঞ্চল নামে খ্যাত এ গ্রামে রয়েছে একটি বড় জলমহাল। এই জলমহাল থেকে আয় হয় বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা। আর এই টাকাগুলি গ্রামের কতিপয় কিছু লোক ভক্ষন করছে।

তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নির্যাতন। করা হয় সমাজচ্যুত, গ্রামে আসতে দেওয়া হয়না। গ্রামে আসলে গুনতে হয় জরিমানা। এমনকি পুজা পর্বন ও আত্নীয় স্বজনের জানাযায়ও অংশ গ্রহন করতে দেয়া হয়না। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানিয়েছে ওই গ্রামের মাতব্বররা।

চার মাতব্বরা হলেন খাগাউড়া গ্রামের মৃত লোদাই মিয়ার ছেলে শওকত মিয়া, মৃত আব্দুর নুরের ছেলে শাহ গেদা মিয়া, মৃত শওকত আলীর ছেলে আব্দুস শহীদ, মৃত আছাব মিয়ার ছেলে আব্দুল মালিক ওরফে সেগেন মিয়া। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের অজ্ঞতা, বর্বরতা, কুসংস্কার, তমসা বা অন্ধকার তাদের আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছে।

ওই গ্রামে মাতব্বরদের কথা না শুনলে বা তাদের দলে যোগদান না করলে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়, ঘর ছাড়া করা হয় বা একঘরে করে রাখা হয়। অর্থাৎ পাঁচের বাহির। দেহ ব্যবসার অপবাদ দিয়ে একটি পরিবার অথবা একজন মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়া হয়। যদি ঐ লোককে আবার সমাজে ফিরতে হয় তাহলে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মাতব্বরদের খুশি করতে হয়।

খাগাউড়া গ্রামের ভূক্তভোগী মহিবুর রহমান হিরা বলেন, ওই গ্রামের মাতব্বদের কু-কমের প্রতিবাদ করায় তাকে সমাজচ্যুত করা হয়, তিনি মাতব্বরদের দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন এবং গ্রামের মাতব্বররা তাকে শর্ত দেয় যে তুমি টাকা দিয়ে গ্রামের পঞ্চায়েতে উঠেছ মাত্র কিন্তু তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারবে না, কারন সে-ও পাঁচের বাহির। যদি বল তাহলে আবারও জরিমানা দিতে হবে, এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি হাউমাও করে কাঁদতে থাকেন।

শুধু কী তাই? কাহারও মা বা বাবা মারা গেলে, তাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাকে দাওয়াত দেওয়া যাবে, কাকে দাওয়াত দেওয়া যাবে না।এই সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তাকে গ্রাম ছাড়া করা হয়।

একই গ্রামের ভূক্তভোগি জুনাব আলী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মাতব্বদের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রাম ছাড়া করা হয় এবং ঘোষনা করা হয় ঐ ছেলেকে গ্রামে দেখলে তাকে ধরে পঞ্চায়েতের মুখোমুখি যে করে দিতে পারবে তাকে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। ঐ সময়ে তার দাদা মারা যায় কিন্তু ঐ লাশ দাফন করতে সে জানাজায় শরীক হতে পারেনি ঐ নিষেধাজ্ঞার কারণে।

এর মূল কারণ ওই গ্রামে বড় একটি জলমহাল রয়েছে। বৎসরে প্রায় ৪০ বা ৪৫ লক্ষ টাকা ঐ জলমহাল থেকে আয় হয়। ঐ টাকা গুটিকয়েক লোকে ভাগবন্টন করে ভক্ষন করে আসছে। যদি পঞ্চায়েতের মাধ্যমে প্রতিবাদী লোকদের উপর খড়গ না ছাপানো যায় তবে তারা প্রতিবাদি হয়ে উঠে। ফলে এ সমস্যা গুলো মাতব্বররা ইচ্ছে করে তৈরী করে এই অপশাসন চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৭/৮ বছর যাবত।

একই গ্রামের প্রদীপ সূত্রধর হৃদয় বিদারক দৃশ্য জানাতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার উপর গ্রাম্য মাতব্বরদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে সে তার বাড়িতে পূজায় শরীক হতে পারেনি। বাড়ির ফসলাদি মাতব্বরের লোকজন কেটে নিয়ে যায়। অনাহারে অর্ধাহারে গ্রামের বাইরে থেকে দিন কাটছে তার।
খাগাউড়া গ্রামের জনাব আলী বলেন, গ্রামের একজন সদস্য হিসাবে জলমহালের হিসাব চাইতে গিয়ে আমার উপর শুরু হয় অসানুষিক নির্যাতন, বের করে দেয়া হয় প্রাম থেকে। প্রায় তিন বছর আগে ৪ বছরে মেয়ে তারিন আর ৩২ দিনের ছেলে আরিয়ানকে রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। আজ পর্যন্ত বাড়িতে গিয়ে আমার সন্তানদের দেখতে পারিনি। গ্রামের আশ পাশেই গেলেই মাতব্বরের লোকজন আমাকে মারপিট শুরু করে।
একই গ্রামের মঞ্জু মিয়া জানায়, আমি বিয়ে করার সময় মাতব্বরদের কথার অমান্য করে গ্রামের অন্য একজনকে দাওয়াত করার কারনে আমাকে গ্রাম ছাড়া করা হয়েছে, আমি দুই বছর যাবৎ বিয়ের পর দিন থেকেই গ্রামের বাইরে। রাতের আধারে কোন কোন দিন বাড়িতে এসে স্ত্রীর সাথে দেখা করে আবার ভোররাতে গ্রামের কেউ দেখার আগেই চলে যাই।

সম্প্রতি ভূক্তভোগি খাগাউড়া গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে জুনাব আলী বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর চার মাতব্বরের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

পরে তিনি বাহুবল থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে কোর্টে প্রেরণ করে। আদালত তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরন করেন। গত ঈদের দুইদিন আগে তারা জামিনে মুক্তি পেয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় মারমুখি অবস্থান নিয়ে গ্রামে ডুকে। গ্রামে ডুকার আগে রইচগঞ্জ বাজারে গ্রামের নিরিহ কয়েকজনের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ হামলায় অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় জুনায়েদকে সিলেট হাসপাতালে নেয়ার পথে সে মারা যায়।

গ্রামের বাসিন্দা আফিল উদ্দিন জানান, তাদের হাত অনেক লম্বা, তাদের কাছে বিলের আয় রয়েছে কয়েক কোটি। ওই টাকা দিয়ে তারা পুরো গ্রামকে নস্ট করে দিবে। তাই তাদের বিরুদ্ধে এতদিন কেউ কথা বলেনি।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •