হবিগঞ্জের বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষা তদন্ত অসন্তোষ প্রকাশ : বিশেষ দায়িত্বে ৭ জন কর্মকর্তাকে প্রদান

28 total views, 1 views today

আজিজুল ইসলাম সজীব :: প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বাহুবলে ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়কে দেখভাল করার জন্য আছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। সেই অফিসে একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও দুই জন সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ফলে কেবলমাত্র নামকাওয়াস্তে চলছে বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া, শিক্ষকদের যখন খুশি তখন স্কুলে আসা-যাওয়া, শ্রেণিকক্ষে গাইড বই দেখে পাঠদান করানো, অন্যকাজের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নির্ধারণ না করা, সরকার বরাদ্দ দিলেও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ না থাকা, কোনো কাজ না থাকা সত্ত্বেও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে উপজেলা পরিষদে প্রধান শিক্ষকদের সময় কাটানো, ক্লাসরুমে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকা, শিক্ষকরা গ্র“পিংয়ে ব্যস্ত থাকা এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সকল শিশুকে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে না পারাসহ নানা কারণে বাহুবলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটছে না।

শিক্ষকদের ‘সভ্যতার সংকটে’ বহু অভিভাবক সন্তানদের ‘ব্যবসার জন্য গজিয়ে ওঠা’ কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলগুলোতে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, বহু শিক্ষক তাঁর নিজের সন্তানকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি না করে কেজি স্কুলে পড়াশুনার জন্য পাঠাচ্ছেন। আর কেজি স্কুলও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যর্থতায় মনের আনন্দে পড়াশুনার নাম করে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
পরিস্থিতির উত্তরণে সম্প্রতি বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জসীম উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন শুরু করেছেন। মাত্র দু’দিনে ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দৈন্যদশার চিত্র খূঁজে পেয়েছেন তিনি। শোকজ করেছেন ১৭ জন শিক্ষককে। সকাল সোয়া ৯টায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও এসব শিক্ষক হাজির হয়েছিলেন সাড়ে ১০টার পরে। এজন্য তাদেরকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজ পাওয়া শিক্ষকরা হলেন, মৌড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষক, বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিকের ৭, ডুবাঐ সরকারি প্রাথমিকের ৪, কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিকের ১ এবং গাজীপুর সরকারি প্রাথমিকের ২ জন শিক্ষক। এই শোকজের খবর শুনে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

বাহুবলে প্রাথমিক শিক্ষার দৈন্যদশা ঘুচাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা প্রশাসনের সাতজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে ‘মনিটরিং টিম’ গঠন করেন। ওই টিম বাহুবলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করবে। ওই কর্মকর্তারা পরিদর্শনে কি কি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর খূঁজবেন। পরে পরিদর্শন প্রতিবেদনাগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। সেই প্রতিবেদন নিয়ে সমন্বয় সভায় আলোচনার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জসীম উদ্দিন বলেন, বাহুবল উপজেলা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে, শিক্ষাকে এগিয়ে নিতেই উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।

গত ১ আগস্ট বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ‘প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে মনিটরিং জোরদারকরণ’ শিরোনামে একটি চিঠি জারি করে বলা হয়, ‘উপজেলার ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধিসহ নানামুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে দায়িত্বশীলতা ও গুণগত শিক্ষার দিক থেকে বাহুবল উপজেলা খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই।’

পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মনিটরিং জোরদার এবং কার্যকর শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে সাতজন কর্মকর্তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হল। দায়িত্ব পাওয়া এই সাত কর্মকর্তাকে বাহুবলের সাত ইউনিয়নের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সহকারি কমিশনার (ভূমি, এসিল্যান্ড) মনিটরিং করবেন বাহুবল সদর ইউনিয়ন, উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা মিরপুর ইউনিয়ন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাতকাপন ইউনিয়ন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা লামাতাসি ইউনিয়ন, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পুটিজুড়ি ইউনিয়ন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা স্নানঘাট ইউনিয়ন এবং উপ-সহকারি প্রকৌশলী (জনস্বাস্থ্য) ভাদেশ^র ইউনিয়নের প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন।

দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদেরকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হবে। পরিদর্শনে গিয়ে তারা কি খূঁজবেন তারজন্য ১৫টি প্রশ্ন প্রস্তুত করে দেয়া হয়েছে উপজেলা প্রশাসন থেকে। প্রশ্নগুলো হল-শিক্ষকরা সময়মত বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া (সকাল সোয়া ৯টা থেকে বিকাল সোয়া ৪টা) করেন কি না, শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আছে কি না, দৈনিক সমাবেশ সময়মত এবং সঠিকভাবে হয় কি না, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার এবং এ বিষয়ে শ্রেণি শিক্ষকের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, বিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলার পরিবেশ, ক্লাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীর পাঠ মূল্যায়ন হয় কি না, স্কুলের সার্বিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা হয় কি না, শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষা সহায়ক ব্যবহার হচ্ছে কি না, অভিভাবক ও মা সমাবেশ প্রতি মাসে হয় কি না, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা স্কুল পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা করেন কি না, বিদ্যালয়ে স্কাউটের কার্যক্রম আছে কি না, বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা ও সার্বিক কর্মপরিকল্পনা আছে কি না, ক্যাচমেন্ট এলাকার শিশু জরিপের তথ্য হালনাগাদ আছে কি না, পুর্ববর্তী পরিদর্শনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়গুলোর উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মনিটরিং টিমে জায়গা হয়নি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের। অনেকেই বলেছেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাধ্য হয়ে অন্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মরিটরিং টিম গঠন করেছেন। এমনকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে যাচ্ছেন। অবশ্য এনিয়ে বাহুবল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কোনো ‘হেলদোল’ নেই। প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ‘যেন কিছুই হয়নি।’ জানতে চাইলে বাহুবল প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মজিদের মোবাইলে ফোন দিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই বলেন, কিছু জানতে চাইলে অফিসে আসুন, মোবাইলে কিছু বলা যাবেনা।

জানতে চাইলে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য বলেন, বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষা উত্তরণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কিন্তু নতুন নয়। শুধু পুরনো বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টদের নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় বিষয়গুলো শিখে এসেছেন। কিন্তু স্কুলে এসে তারা এগুলো প্রয়োগ করেন না। এতে বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষা নিন্মমুখী হচ্ছে। এই নিন্মমুখী থেকে ঊর্ধ্বমূখী করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন সংশ্লিষ্টরা যদি এগুলো মেনে চলেন তাহলে বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি ঘটতে বাধ্য। আর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি হলে কেজি স্কুলগুলোর ব্যবসাও কমে যাবে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকের সন্তান কেজি স্কুলে পড়ে তাদেরকে অবিলম্বে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য আদেশ দিতে হবে এবং এটি জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করতে হবে। ক্যাচমেন্ট এলাকার বহু শিশু সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি হয় না। এই ভর্তি না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষকদেরকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তির হার বাড়বে।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares