‘মেঘ রঙে ঝাপসা ডানা’-

1,488 total views, 1 views today

” ঈস্পিতা অবনী”

শেষ মিনিট অব্ধি তারা কখনো একজন অন্যজনকে কিছুতেই বলেনা যে পাঁজরার ভেতরের যন্ত্রটার লাবডুব বিট্‌ টাল খাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে কিছু খুঁজে চলেছে। চোখের পাতা ধোঁয়ার জালে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যাচ্ছে প্রায়। বলে বড়ো জোর এইটুকুনিই,

-উফফ কদিন ধরে চোখটা জ্বালাচ্ছে খুব। পাওয়ার চেক করাতে হবে আবারো। কাল অফিস ফেরত একবার ঘুরে আসব ভাবছি। গচ্চা দেয়ার আর শেষ নেই। তোর গোছানো কি হয়ে গ্যাছে? লাস্ট মোমেন্টে যা করতে থাকিস না তুই!

-ওঃ প্লীজ মা। সবসময় আমার পেছনে পড়ে থেকো না। একই প্রশ্ন আর কতোবার বলো? দুচারটে জিনিস পড়ে থাকলে থাকবে, তাতে কিচ্ছুটি হবেনা।

-তাতো বলবিই! কিনে কিনে পাহাড় করিস, কত যে টাকা নষ্ট করিস, হিসেব আছে!

-টাকা নষ্ট, টাকা নষ্ট! বাতিক হয়েছে তোমার একটা। যা কিনি সবি ব্যবহার করি, বুঝেছো? সব সময় তানা দিওনা তো।

-করলেই ভালো। নিজের টাকা, নিজের রোজগার। সে যাই হোক, গুছিয়ে নে। তুই রওনা হলে কাল বা পরশু জেঠিমার ওখানে যাব ভাবছি।

-হ্যাঁ, ভালো তো- যেও।

এগুলো একদম অবান্তর কথার খেলা, কিছু একটা বলতে হবে বলেই বলা মাত্র। আসলটা বুঝতে না দেয়া। এগুলো পাশ কাটানো। ওরা মালতি আর প্রিয়ন্তি। কদিনের ছুটি। প্রত্যেক বুধবারের পরে অবধারিত বৃহস্পতিবারে আসবেই, আবার শনিবার রাতেই উড়াল দেবে। বদল হয়না। সেই সকাল থেকে মালতি পূবের ব্যালকনিতে বসে থাকে সামনে কাগজ বিছিয়ে, যতক্ষণ রোদ আছে। অসমান অক্ষরগুলো নাচতে নাচতে লাইনকে লাইন ঢেউ হয়ে যায়। হাসিনা-মুহিত-মতিয়া-মির্জা ফখরুল। মোশাররফ-তাহসান-শাকিব-অপু- সানি লিওন। সাকিব-মুশি-ম্যাশ-ওয়ার্নার-কোহলি। হ্যারি লোম ফুলিয়ে পায়ের কাছে ঝিমোতেই থাকে।

জানিস, সকালের রোদ্দুর আর খালি চেয়ার বলছিলো, হ্যাঁ গো, শুনছো! তোমার কথাবলা পাখিটা কই! ওই যে তোমার সই? আলুঝালু পাগলিটা বেলা সাড়ে দশটায় ঘুম ভেঙে আধখোলা চোখে গালে চুম দিয়ে বলবে, আজ কি ব্রেকফাস্ট মা? মুখে ব্রাশ ঢুকিয়ে একগাদা ফেনা নিয়েও বকবকানি মেয়ের। টিভিতে গাঁকগাঁক করে মাস্টার শেফের সেই পুরনো একি এপিসোড।

– ম- ম- মম এট বনাব ওজ? চও…

– ধুর, মুখ ধো-তো। ওসব কন্টিনেন্টাল ডিশ বানানো অনেক ঝঞ্ঝাট। যা বানিয়েছি খেয়ে নে মামন।

ব্রেকফাস্টের থালা হাতে কয়েক লাফে ব্যালকনির চেয়ারে। দুপায়ের ওপরে ছড়ানো নিউজপেপার, এপাতা ওপাতা, নিমিষেই শেষ।

-ওহ, কচুরি! গ্রেটটট- হাত এঁঠো, পাতাটা উলটে দাওনা মা। আমার হচ্ছে সুপার-ফাস্ট পেপার রিডিং। অত খুঁটিয়ে পড়ার টাইম আছে বলো? হাতের কৌটুতে কিগো তোমার!

– ওই যে হেয়ার-প্যাকটা মাখাবো তোকে আজ। যা চুল উঠছেনা তোর। এই এই, কী নোংরামো! আমার গায়ে ফেলছিস কেন? এহহ্‌ মাথা খালি হয়ে গেলো যে রে।

-দাঁড়াও দাঁড়াও আগে শান্তিতে খাওয়াটা তো শেষ করতে দাও। সব একসঙ্গে। এত হড়বড়াও কেন? ওই রাবিশ মাখবো বলছি না তাহলে। এত চুল উঠছে কেন বলোতো?

-বড়ো অসুখের পরে এরকম চুল ওঠে জানিস। রীতাকে দেখিস না?

-টাকলি হয়ে যাব নাকি? হি হি

-হয়ে যেতেও পারিস।।

-হ্যাঁ, তুমি তো সেটা চাইবেই। খালি নেগেটিভ চিন্তাভাবনা। নিজের অনেক আছে কি না!

-আরে আরেঃ! আর গজাবে না বলেছি নাকি? মেখে নে তো, অন্তত ঘন্টাদুই রাখতে হবে কিন্তু। বিকেলে যাতো একবার, চুলগুলো ছেঁটে আয়।

– এমা, কত কষ্টে লম্বা করেছিলাম, কিন্তু লাভ হবে কিছু? ঠিক আছে, যাবো কাল। তুমিও চলো, কী বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে মা তোমাকে। কতবার বলি আপার-লিপ্‌ টা করে নাও, ক্লিন লাগবে।

-যা তো, জ্বালাস নে। নিজেরটা ঠিক কর।

অঢেল এই শান্ত দুপুরে মালতি স্রেফ চালেডালে মটরশুঁটিতে গলাভাত, তারপর আধশোয়া। পাতলা কাথা দিয়ে ঢাকা পা, কোমর। বিছানার অন্যদিক বেজায় খালি, এক্কেবারে ফাঁকা। চশমাটা মুছতে হচ্ছে বারবার। আলো কম! দূর যাঃ, পাওয়ার চেক করিয়ে আসতে হবে। টক্কর বক্কর লুডোর ছক্কা কথা বলছেনা। আধপড়া কাগজ, না-পড়া দেশ পাশে ডাঁই হয়ে রোজকার মতো। এবারে খানিকটা মনোযোগ পেতে পারে ওরা, যদি অবশ্য মন বসে। তা, যদির কথা নদীতেই বয়ে যায়। ইচ্ছেই করেনা।

-একবার খেলোনা মা, প্লীজ। আরে তুমিতো এমনিতেও হারবেই। হা হা, এইতো এমনি লুডোতেও হেরে গেলে। সাপলুডো তোমার পছন্দের না! হুশ করে ওঠো- আবার হুঁশ করেই নামো! দেখো এই সাপটাকে, কি খতরনাক বাবা- কী মোটা উঃ! হি-হি।

-এই ধেড়ে মেয়ে খাটের ওপরে উঠে দাঁড়িয়েছিস? আবার হাঁটছিস? জানিস এটা কবেকার খাট! তোর জন্মের আগে। নিজেও তো সাতাশ হবি কদিন পর।

-উফফফফ, জানি। কতোবার এক কথা বলো। ধেড়ে মেয়ে মানে টা কি গো, হ্যাঁ? আর সা-তা-শ? আঃ আমার মোটে তেইশ বছর এগারো মাস চব্বিশ দিন মা। তুমি ওইদিন বললে যে আমাকে আঠারো- কুঁড়ি দেখায়! আর নিজে কত? পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছো না!

-আসল তো আর আঠারো- কুঁড়ি বছর নয়। গরমকালে ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরিস বলে ওরকম দেখায়। আর আমি কি খাটের ওপরে লাফাই নাকি হ্যাঁ? বোকার মতো কথা বলিস, মাথা খারাপ করিস নাতো- যা এখান থেকে।

-অবকোর্স তুমি লাফাতেই পারো! চলো লাফাই, হি হি। ছাড়ো তো দেখি, চলো ফেলুদা দেখবো ল্যাপিতে। হল-এ তো আর যাওয়া হচ্ছে না, আর এখানকার হল-এর যা পরিবেশ। কোনটা দেখবে বলো। আর তুমি দেখবেই বা কি! ঢুলুঢুলু বুড়ি দেখবো এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়েছো। একটা সিনেমাও পুরো দেখতে পারো না তুমি মা।

-না ঘুমাবি না! তুই রাত ফুটো করে ল্যাপটপ খুলে চ্যাট করবি, সিনেমা দেখবি নাকি আরো কিছু করবি, কি জানি! আলো পড়েনা চোখে?

-রাজহাঁসের মতো প্যাকপ্যাক করোনা তো! ওকে, রাত্তিরে আমি লিভিংরুমে একাই শোব। তখন আবার বলতে এসোনা যেন, এতোদিন পরে এলি, আমার কাছে শুবি না! আর হ্যাঁ প্লিজ শোনো, আমি চ্যাট ফ্যাট করিনা। অফিস প্রজেক্টের কাজ থাকে। ছুটি নিয়ে এসেছি তো কী! কম্যিউনিকেট করতে হয়, ডাটা পাঠাতে হয়… প্রেশার কী বুঝবে তুমি। এবার এম-বি-এ এ্যাডমিশনের ট্রাই করছি, জানো না যেন?

-এই কদিনের ভেতরে কলকাতা গিয়ে চারদিন থাকার কি দরকার তোর মামন? তোর বাবা ছুটি নেবে ভাবছিস? নিতো কোনোদিন?

-সে দেখা যাবেক্ষন্। তুমি প্লীজ ওই এক গল্প রিপিট করোনা বারবার, ভাঙা টেপরেকর্ডারের মতো। বাবা ছুটি নেবে কীনা, আমি বুঝবো। তোমার ব্যাপার তো না! কালও ফোন করেছিলো যাবার জন্যে। আবার তো ফিরবো। ফেরার টিকিট তো কলকাতা থেকেই আছে, নাকি?

-হুঁ। ঘুমোই এবার একটু। ছুটির দিনে দুপুরে একটু না শুতে পারলে হয়? তুইও ঘুমো না!

-এইতো তোমার শুরু হল। তাহলে আমি আসিই বা কেন, আর তুমি বা কেন ছুটি নিয়েছো? ঘরে বসে থাকবো এই ঠাণ্ডায়, অন্ধকারে? চলো কেএফসি থেকে পিৎজা খেয়ে আসি।

-এক্ষুণি না ভাত খেলি! আর, অর্ডার দিলে তো ঘরেই দিয়ে যাবে।

-তাহলে চলো মুভি দেখে আসি। তোমার প্রিয় তৌকির আহমেদের ‘অজ্ঞাতনামা’ চলছে।

-বেলাশেষে দেখবি? কবে থেকেই চলছে। খুব সুন্দর নাকি!

-না। ওসব টিপিক্যাল কেথ্রিজি-টাইপ মুভি তুমি তোমার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে দেখো। চলো ‘আয়নাবাজি’ দেখবো। হিট হয়েছে। আহঃ চঞ্চল দা।

-আচ্ছা, চল যাবি তো।

-কিন্তু হল-এ বসে ঘুমোবে না মা। টিকিটের দাম কিন্তু অনেক। টাকা জলে যাবে এক্কেবারে।

-চেষ্টা করবো চোখ খুলে রাখার।

-ওহঃ সত্যি মা,….. কী বোর তুমি। আচ্ছা চলো যাই।

হলে বসে থাকতে থাকতে খোঁচা, আর ইন্টারভ্যালে পপকর্ণ বাকেট।

-এই নাও পপকর্ন। আবার ঘুমাচ্ছো! ভালো লাগছে না মা?

-না রে ঘুমোচ্ছি না। কী লম্বা সিনেমা রে বাবা। ধুমধারাক্কা…

-হুঁ, খুব লম্বা। থ্রিলার টাইপের মুভিগুলো এরকমই হয়। আমার তো বেশ লাগছে।

-হুঁউউউউ দেখলাম

-দেখছো মা, সমানে ম্যাসেজ আসছে। তিনটে কিনলে দুটি ফ্রি। হি হি…

-আমারো আসছে। এত গরমজামা দিয়ে কি করবো রে?

-চলোই না দেখে আসি। ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে নাকি তোমার? স্যাঁতস্যাঁতে, ঠান্ডা। এখানে রোদই ওঠেনা আদ্ধেকদিন।

-মা, বাবার জন্যে একটা নিয়ে নিই। কলকাতায় গিয়ে দিয়ে দেবো।

-কী দরকার? যাকগে, যা ভালো বুঝিস কর।

-তুমি এখানে খোঁজো, কার্ডিগান, কুর্তি-টুর্তি। আমি ওয়েস্টার্ন সেকশনটা দেখে আসছি ওদিকটায়।

-কি রে হলো! পছন্দ হলো?

-না খুঁজছি তো। দুটো মোটামুটি পছন্দ করেছি। আরো তিনখানা। হি হি। ওইকটা তুমি খুঁজে নিয়ে নাও।

-ধ্যাৎ। পছন্দ না হলে কি করে নেব? আর দামের হিসেব কি করে হবে রে?

-সবকটার ম্যাক্সিমাম প্রাইস ধরবে। তারপর দুটো ফাউ…

-ওরে বাবা, অনেক হয়ে গেলো যে-রে। অত ক্যাশ এখন আনিনি আমি। কার্ড থেকে দিতে হবে। দ্যাখ পছন্দ হয়েছে সবগুলো তোর? তোদের ওখানে আর ঠান্ডা কই এখন?

– হি হি… এই একটা ছাড়া বাকিগুলো বেশি পছন্দ হলো না। তাও নিয়ে নিলাম। তোমার?

-আমিও জোর করেই নিচ্ছি। কি করবি তাহলে! পরবি তো? ফেলে রাখিস না।

-তুমি কি করবে? নেবে তো! আমি এটা নিই খালি, আর বাবুরটা। তুমি একটা নাও। নেবে? পছন্দ হয়েছিল যে ব্ল্যাক-টা?!

-কী ভাবলো মা ওরা, পাঁচটা সোয়েটার দলামোচা করে করে কাউন্টারে রেখে এলাম? হি হি।

-আড়াইঘন্টা তিড়িংবিড়িং নাচালি। পায়ের অবস্থা এমনিতেই খারাপ।

-ঠিক আছে, রান্না তো নেই। আজ পিৎজা ডিনার। কাউন্টারের ছেলেটা কিরকম গলে পড়ছিল দেখলে! স্টুপিড না? একগাদা এক্সট্রা পাউচ দিয়ে দিলো। দেখতে বেশ স্মার্ট আছে না!

-সেতো তোকে দেখে। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলো।

-জানি তো। এরকম করেই বোকাগুলোকে কাজে লাগাতে হয়, বুঝেছো? তুমি কিছু নিলে না!

-পছন্দই হলো না, কি করবো?

-আচ্ছা এই নাও। ক্যাণ্ডেল-স্ট্যান্ড। সুন্দর না! বলো!

-ওমা, কখন নিলি এটা! আড়ং থেকে? বাঃ।

-ওই যে তোমাকে দাঁড়াতে বলে গেলাম, তখন। জ্বালাবে কিন্তু মাঝে মাঝে, ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে চেঞ্জ করবে।

পিকনিক পার্টি- ভেণ্ডার হকার। লাল-নীল হলুদ সাদা গ্যাসবেলুন সিলিণ্ডারের শাসন ছেড়ে উড়ে পালাতে চাইছে এক্ষুনি। মেয়ের হাতে গোছাবাঁধা বেলুন। লোকজন তাকিয়ে আছে, বয়েই গেলো।

-গ্যাসবেলুন নিচ্ছি মা। ওওও মা…

-হ্যাঁ, লোকে হাঁ করে দেখছে মামন। টাকা দিয়েছিস?

-না দিয়ে দাও না তুমি। আরেঃ আরেঃ… মা আআআ…

-কী হলো রে বাবা!

-নীল বেলুনটা উড়ে যাচ্ছে দেখো না-আ। আর তুমি শুধু বাঁদরের ছবি তুলে যাচ্ছো! ম্যানিয়া! ওই যে দেখো গাছে গিয়ে আটকেছে বেলুনটা। এ-ব্বাবা। কাউকে টাকা দিলে পেড়ে দেবে না! অন্তত লাঠির খোঁচা দিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিতে পারতো! আটকে গ্যাছে। কী বিচ্ছিরি!

-আরেকটা কিনে নিলেই পারিস। রাস্তার মধ্যে পাগলামি করিস না মামন।

-জানো মা, আমার বেলুন দারুন লাগে। বাবুর কাছে যখন চাইতাম বাবু কিনে দিতো, অনেকগুলো।

-জানি, ছোটোবেলা থেকেই তো এমন। সেইযে গাঁয়ের চৈত্রসংক্রান্তির মেলায়।

– হি হি হি তোমার মনে আছে মা! বেলুন হাত ফসকে উড়ে যাওয়ায় কি’যে কান্না করেছিলাম।

ইজ্‌ ক্লান্তি ইকোয়েল ট্যু ঘুম?
যদিও সব সময়ে মেলেনা, পাশাপাশি বালিশে মাথা- দুজনে মুখোমুখি। পায়ের ওপরে কাথা, বুক ঢাকা। ঘুমও বড্ড ক্লান্ত। কথাবলা পাখি গড়গড় করে, তার বন্ধু আর বান্ধবী, তাদের বান্ধবী আর বন্ধু। ফ্যালমেট নাদিয়া লেসবি। নিজের মতো করে থাকে, খুব ইন্ট্রোভার্ট। অফিস ক্যাম্পাসে সিনিয়ার মিঃ সাজ্জাদুর রহমান গে। দারুণ স্মার্ট, ফোর্টি-প্লাস। মালতি শুনে যায় নীরবে, ঘুমঘুম চোখ। টুকটাক মন্তব্য ছাড়ে। বিয়ের বয়স, শরীর কী বলে! ধর্ষণ নামের বিভীষিকা। আইনের ফাঁক।
স্কুল লাইফে ক্লাসের ছেলেদের পছন্দ করতো না একদম। বিরক্ত করলে তেড়ে উঠত। বাড়ি এসে মুখ গোঁজো করে থাকতো। মালতি বুঝে যেতো। কী করে তবু ক্লাস টেনের শেষে তাকে একজন পটিয়েছিলো। দুবছরের সিনিয়ার ছিল ছেলেটা। ফর্সা, নাদুসনুদুস, লম্বা। মালতির এমনকি নামটাও মনে আছে। দু’একবার দেখেছিলো। বছরদুই বোধহয় টিঁকেছিল সম্পর্কটা। মেয়ে এখনও সিঙ্গেল। কাউকে পাচ্ছেনা? মালতির যে আজকাল ইচ্ছে করে শাশুড়ি সাজতে।

-ওই ছেলেটার কি খবর মামন?

-কে?

-ওই যে, তুই টেনে পড়তিস- তখন। মনে আছে তোর বাবুর কী ঝাড় আমাকে!

-ও অতনু? ধূর, কে জানে কোথায় আছে? এখন বোধহয় ইউ-এস-এ থাকে।

-ভালো তো রে, যোগাযোগ হয়না অতনুর সাথে?

-ওহ্‌ পারোও মা তুমি, খুব বাজে একটা ছেলে। ধান্দাবাজি করতো।

-অনেক তো হলো। এবার বিয়ে কর না মামন, কবে করবি! কেউ প্রপোজ করে নি তোকে?

-দূর্‌ বাবা। আমি নিজের চাকরি নিয়ে ফেঁসে আছি। ডিস্টার্ব করো না তো মা।

-আচ্ছা করিসনে তাহলে। সময় করে একটা ঘরজামাই ধরে নিয়ে আসবো।

-প্লীজ মা।

-জানিস আমার সহকর্মী ফারজানা এক্সট্রা-ম্যারিটালে জড়িয়েছে। ভদ্রলোক কিছুদিন আগে জয়েন করেছেন আমাদের এখানে। শান্তনু মিত্র। কী ঝামেলা তাই নিয়ে। হাজব্যাণ্ড মুজিবুর রহমান এসে অফিসে হাজির একদিন…

-তারপর!

-আর কি! সব জানাজানি। ওর ছেলেটা এবার মেট্রিক পরীক্ষা দেবে। বরটা দেখতে যথেষ্ট হ্যাণ্ডসাম। বেশ ভালো কথাবার্তা। কেন যে এরকম করলো ফারজানা? অনেক জলঘোলা, কেসটেস, হুমকি। ওই ভদ্রলোক মানে শান্তনু ছাড়ার পাত্র না, তার ফ্যামিলিতে অনেক ঘোটালা আছে।

– ওহহহ কীযে করো না তোমরা। তুমি প্লীজ অন্যের এসব ঝামেলায় জড়িও না মা। যেমন আছো তেমন থাকো চুপচাপ।

-আমি নেই মামন এসবের মধ্যিখানে। শুনি ব্যাস। ফারজানা আমাকে বেশ পছন্দ করে। একলা বসে খুব কাঁদছিলো একদিন, বলছিলো একটু একটু। জানিসই তো, ছেলেদের এমনিতেও তেমন পছন্দ করিনা। তোর বাবুর মেজাজ দেখতিস না? ইগো শুধু ইগো! সে চলে যাবার পর থেকে, এতবছর একাই কাটাচ্ছি।

-চ্যাপ্টার ওভার মা। প্লীজ, ডোন্ট রিপিট! রিপিট করা স্বভাব তোমার। চেঁচাতেও কম না তখন। দোষ তোমারো ছিলো, বাবু একা দোষী নয়। আমি এই বিষয় নিয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছিনা প্লীজ। ক্যানক্যানে গলায় আমার ওপরে এখনো চেঁচাও তুমি। আর, আমাকেই বা কেন বিয়ে-বিয়ে করে ক্ষেপাও তাহলে? প্লীজ মা। আমার কেউ নেই। আমিও আগের চেয়ে এখন অনেক ম্যাচিওর। যখন ভালো পাবো, জানাবো। আর দেখো, বাবুও তো একাই থাকছে, থাকছেনা!

-তাহলে একা থাকা ভালো বলছিস তুই?

-অবকোর্স। একটা লেসবিয়ান বান্ধবী জুটিয়ে নাও, ছেলেদের তো তোমার ভালো লাগেনা। ব্যাস। মনের কথা বলবে। চলো লুডো খেলি। স্ক্র্যাবল তো এবার খেলাই হলোনা। খেলবে?

-না মামন, এবার ঘুমাবো। এইতো আমার লেসবিয়ান বান্ধবী, পাগলিটা। ঊফফফফ, পা যা ব্যথা করছে রে মামন!

-আচ্ছা, ঘুমাও তাহলে। একটু ভলিনি লাগিয়ে দিই, ব্যাথা কমবে। তারপর আমার পিঠটা একবার চুলকে দেবে? এবার দাওনি কিন্তু। আর, এবার তো আমার পছন্দের বিরিয়ানিও খাওয়ালে না মা?

-হলো! আচ্ছা, কাল বানিয়ে দেব। এবার ঘুমো সোনা মেয়ে।

– হুঁ, পায়ে ব্যাথা না থাকলে দিও।

হ্যারির পায়ের একটা নখ উপড়েছে, রক্ত বেরিয়েছে খুব। সঙ্গে সঙ্গে ড্যাটল তুলো ব্যাণ্ডেজ।

-ইস ইস, কী করে এরকম করলি হ্যারিসোনা! খুব কি ব্যথা করছে? এইতো, এইতো। এরকম ছটফট করলে কী করে ওষুধ লাগাবো, বল? তুই কি আমার ওপরে রেগে আছিস? মা, হ্যারি কি রেগে আছে? লাল কুকুর ছানাটাকে পাশের ড্রেন থেকে তুলে দিলাম বলে! জানো মা, ও না বড্ড হিংসুটে।

-রাগ করাটাই স্বাভাবিক। ওই নোংরা ঘেয়োটাকে ড্রেন থেকে তুললি, তারপর দুধ-পাঁউরুটি খাওয়ালি। তুলেছিস ঠিক আছে, খেতে দেওয়ার কি ছিলো আবার?

-ইস কি ছোটো মা ওটা। এই ঠাণ্ডায় খেতে না পেলে মরেই যাবে হয়তো! বাড়িতে তুলে আনবো মা? আমাদের হ্যারির সঙ্গে বড়ো হবে।

-আর ঝামেলা বাড়াস নে মামন। তোর ইচ্ছে হলে দুটোকেই নিয়ে চলে যা তোর সঙ্গে।

-প্লীজ মা, ওকে দেখতে পেলে দিনে একবার অন্তত একটু খেতে দিও। আমি যেখানে থাকি, ওখানে কতগুলো কুকুরকে খাওয়াই জানো তুমি?

-ঠিক আছে। হ্যারিকে এতো চটকাস, চিপে চিপে বিরক্ত করিস। ও পছন্দ করছে না, লোম ও উঠছে কত। ছাড়না খেতে দিই ওকে।

-তোমার জ্বলন হয় না মা! আমি হ্যারিকে আদর করলে? বাবু শখ করে ওকে আমার জন্য এনে দিয়েছিল। ও আমার কিন্তু আসলে।

-হ্যাঁ, তোমার যখন- তুমি সঙ্গে নিয়ে পালাও। আমার ঘাড়ে চাপিয়ে গেছো কেন! বোঝার মতো? কোথাও যেতে হলে দশবার ভাবতে হয়।

-অবকোর্স আমার হ্যারি। আর বোঝা বললে তুমি ওকে মা? এতো সুইট এতোটা মিষ্টি। আবার বলো, ওকে খুব ভালোবাসো? কীসব আবোলতাবোল ডাকোও। ও তোমাকে আনন্দ দেয় না মা?

-না, মোটেও না। নিয়ে যা দেখি ওকে। আমি বেঁচে যাই, নিয়ে যাঃ

– না, ও এখানেই থাক। কত ভালো থাকে এখানে দেখো না! আমার এতো স্ট্যাগার্ড স্কেজিউল।

এরকমি ওরা। কেউ বলেনা-কেউ খোলে না। অথচ কেমন করে জানি বুঝে যায়। তারপর ঢাকাগামী উড়োজাহাজের উইণ্ডো-সীটের পাশে স্বর্ণগোধূলি মেঘমুলুকের বাষ্পে আবছা হয়ে যায়।
মা তুমি কি আমাকে খুব মিস করছো?
ঢাকার কনকনে ফ্ল্যাটটায় কাঁচের জানালা। নিচে বিকেলের মন-কেমন আলো। তাই মেখেই বাস-অটো-ট্যাক্সিরা ভিজে ঝাপসা হয়। এই তো এলি, দিনগুলো মেঘ রঙে ঝাপসা ডানা। আবার কবে রে? কবে আবার?
কোলের ওপরে, হাতের মুঠোতে এলোমেলো টুকরো-টাকরা আর পটভূমিকার বিপুল রোজনামচা। শান্ত হ্যারি তেমনিই গুটিয়ে বসে থাকে। সানশেড-এ পায়রা গুঁগুঁ। খাচায় বন্দী টিয়া। বোবা মুখ বোজা বইয়ের ভেতরে আঙুল, সামনে নিত্যকার গ্রীন-টি’র কাপ, দুটো সল্টেড বিস্কিট, দুধ চা নয়।

মা তুমি না, দুধ চা টা একদম বানাতে পারো না। কী বাজে! এরকম পাতলা হয় নাকি চা? আমি অনেক ভালো বানাই জানো!

আরে, সেদিন তো দুধ ছিল না ঘরে, তাই জল বেশি দিয়ে করেছিলাম, সবসময় কি এমন হয় নাকি?

দেখেছো নিজের দোষ? কিছুতেই ভুলগুলো স্বীকার করো না তুমি মা! আমার কাছ থেকে শিখে নিও।
আমি অনেক কিছু পারি, যা তুমি পারোনা- ‘অন্যরকম হতে পারতো মা সবকিছু।’
আজ খুব মনে পড়ছে, ওই হাত ফসকে ছুটে যাওয়া রঙ্গীন বেলুনটার কথা। গাছের ডালে আটকে ছিলো, হয়তো মুক্তি পায়নি সে।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares