সিলেট নিউজ টাইমস্ | Sylhet News Times

উত্তরাঞ্চলে চা চাষ সাড়া জাগাচ্ছে

62 total views, 1 views today

নিউজ ডেক্স::  এই মুহূর্তে দেশের জন্য একটি উপেক্ষিত ইতিবাচক সংবাদ হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে চা চাষ বৃদ্ধি। কারণ মাত্র কয়েক বছর আগেও ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারীর কোথাও চা বাগানের অস্তিত্ব ছিল না। গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান গড়ে তোলা হয়। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিনাজপুরের বীরগঞ্জের সমতল অঞ্চলও। এসব চা বাগান থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সাফল্য পাওয়ায় ওই অঞ্চলজুড়ে চা আবাদের আগ্রহ বেড়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের এসব জেলার আবহাওয়া চা চাষের উপযোগী হওয়ায় দেখা দিয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও।

সূত্র মতে, উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় সদরসহ তেঁতুলিয়ার উঁচু সমতল ভূমিতে অর্থকরী ফসল সবুজ চা চাষে দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষিবিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট জমির পরিমাণ ১৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষের জমির পরিমাণ ১৪ হাজার হেক্টর। এই স্বল্প পরিমাণ চাষের জমি খনন করে নুড়ি পাথর উত্তোলনসহ বৃহত্ ও ক্ষুদ্র পরিসরে বর্তমানে চা বাগান করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১ হেক্টর করে ধান চাষের জমি হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে তেঁতুলিয়ায় ১২৯০ হেক্টর জমিতে সবুজ চা বাগান গড়ে উঠেছে।

তেঁতুলিয়ায় চা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির পিছনে নানা কারণ রয়েছে। চাষিদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, সবুজ শাকসবজি, আলু, মূলা, কপি, টমেটো ইত্যাদি জাতের রবিশস্য ও ধান চাষ করে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না। তাছাড়া বাজারজাতকরণ সমস্যার কারণে কৃষক এসব ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে। অন্যদিকে হিমালয়বেষ্টিত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজমান থাকায় চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের তুলনায় চা গাছের ফলন ভালো। সঠিক মূল্যে উৎপাদিত চা পাতা বিক্রি সহজ হওয়ার কারণেও চা চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে তিন মেট্রিক টন ফলন হলেও তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড়ে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ছয় মেট্রিক টন কাঁচা চা পাতা উৎপাদিত হচ্ছে।

সূত্র মতে, দেশের উন্নয়নে বিরাট অবদান রেখে চলেছে ফসলটি। এতদিন সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে চা চাষ হতো। কিন্তু গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোও। সর্বশেষ দিনাজপুরের বীরগঞ্জের সমতল এলাকায় এ ফসল চাষে সাফল্য পেয়েছেন নজরুল ইসলাম। এতে পুরো উত্তরাঞ্চলে এ ফসল চাষের এক দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার দেখাদেখি আরো অনেকেই লাভজনক এ ফসলটি আবাদের আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

বীরগঞ্জের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝলঝলি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নজরুল ইসলাম গত বছরের আগস্টে এক একর জমিতে চা চাষ শুরু করেন। এরই মধ্যে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। নজরুল জানান, জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণে খরচ হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। চা চাষে পরিচর্যা ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই। এরই মধ্যে চারবার চা পাতা উত্তোলন করা হয়েছে। ২৫/২৬ টাকা কেজি দরে প্রায় ২৪ হাজার টাকার চা পাতা বিক্রি করেছেন তিনি। গাছের বয়স দুই বছর হলে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকার চা পাতা বিক্রি করা যাবে। এক্ষেত্রে তাকে পলাশবাড়ী ঝলঝলি বহুমুখী সমবায় সমিতি সহযোগিতা করেছে বলে জানান তিনি।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘পঞ্চগড়ের সাকোয়ার এক নার্সারির চা চারা বিক্রেতা শরিফ প্রথম চা বাগান করার পরামর্শ দেন। পরে পলাশবাড়ী ঝলঝলি বহুমুখী সমবায় সমিতির সহযোগিতায় গত বছরের আগস্টে চা চারা রোপণ করি। এরই মধ্যে চারবার চা পাতা সংগ্রহ করে পঞ্চগড় নর্থ বেঙ্গল চা কারখানায় বিক্রি করেছি। গাছের বয়স বাড়লে চা পাতা সংগ্রহের পরিমাণও বাড়বে। তখন প্রতি মাসেই চা পাতা বিক্রি করা যাবে।’

তিনি বলেন, এখানকার মাটি চা চাষের উপযোগী। তবে চা গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে, সেজন্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হয়। প্রচণ্ড রোদে ছায়া দিতে বাগানের মাঝে মাঝে নিমগাছ লাগিয়েছি। খরার সময় পাইপের সাহায্যে পানি ছিটিয়ে দিতে হয় গাছে। বছরে দুবার সার ব্যবহার করলেই চলে। আমি জৈব সার বেশি ব্যবহার করি।’

একই উপজেলার পাল্টাপুর আশ্রায়ন প্রকল্প এলাকার মো. আজাদ আলীও গত বছরের অক্টোবরে এক একর জমিতে চায়ের আবাদ করেছেন। তিনি এখনো ফলন না পেলেও এ বিষয়ে বেশ আশাবাদী।

এ দুই কৃষকের সাফল্যের পর অনেকেই চা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এতে চা চাষ ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বীরগঞ্জ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহজাহান আলী বলেন, প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের জমিতে এরই মধ্যে আঙ্গুর, মালটা, কমলাসহ বিভিন্ন ফলদ ফসলের আবাদ ভালো হচ্ছে। এর মধ্যে বীরগঞ্জের দুই কৃষক চায়ের আবাদ শুরু করেছেন। এখানে চা আবাদের উজ্জ্বল সম্ভাবনাও রয়েছে। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া চা চাষের অনুকূল থাকায় চায়ের উৎপাদন ভালো হওয়া সম্ভব। তবে এজন্য নিবিড় পরিচর্যা, পরিমিত পানি সেচসহ সব বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।

কমেন্ট
শেয়ার করুন