বিএনপিকে আগাম চাপে রাখার কৌশল

17 total views, 1 views today

নিউজ ডেস্ক:: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার তারিখ এত দ্রুত পড়বে, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না বিএনপি। দলটির ধারণা ছিল, মামলার বিচারকাজ আরও এক-দেড় মাস গড়াবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে আগাম চাপে ফেলা এবং দলে বিভক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এই মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করা হয়েছে। রায়ে দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে—এমন কথা এর আগে সরকারের মন্ত্রী-সাংসদেরা নানাভাবে বলেছেন। এই অবস্থায় রায়-পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ শনিবার জরুরি বৈঠকে বসছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি। গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন খালেদা জিয়া।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেন আদালত। গত বৃহস্পতিবার আদালত এ তারিখ ধার্য করেন। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার বলেছেন, সরকার আগামী নির্বাচন করতে চায় বিএনপিকে বাদ দিয়ে। সে জন্যই নজিরবিহীন তাড়াহুড়ার মধ্যে এই মামলা শেষ করার চেষ্টা হচ্ছে।

দ্রুত রায় ঘোষণার দিন ধার্য করার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের মোটা দাগে মূল্যায়ন দুটি। এক. এর মাধ্যমে আবারও বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চক্রান্ত। দুই. সে জন্য রায়ের পর খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বিএনপিতে ভাঙন ধরানো।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুষ্ঠানের। এ লক্ষ্যে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো সংগঠিত হচ্ছিল নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিতে। এই অবস্থায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় দ্রুত সামনে আনা হয়েছে, যাতে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে বিএনপিকে পাল্টা চাপে ফেলা যায়।

নীতিনির্ধারকদের অন্যতম স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এটাকে সরকারের ‘ভয় কাটানোর আত্মঘাতী’ কৌশল বলে মনে করেন। তিনি গতকাল বলেন, ‘সরকার নার্ভাস। তাই আগে থেকে ওপেনসিভ খেলছে।’

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপির কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে দলের ঐক্য আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মধ্যে দূরত্ব কমাতে বৃহস্পতিবার রাতেই বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি এই মামলার রায় সামনে রেখে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের মনোভাব জানার চেষ্টা করছে বিএনপি।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে আগাম চাপে ফেলতে এবং দলে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চায় সরকার। এই মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার পেছনে সরকারের এমন কৌশল কাজ করেছে। রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে—এমন কথা এর আগে বিভিন্ন সময় সরকারের মন্ত্রী-সাংসদেরা বলেছেনও।

এই অবস্থায় বিএনপির পাল্টা কৌশল কী হবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দুই ধরনের মতের কথা জানা গেছে। কারও কারও মত হচ্ছে, রায়ের পরপরই কোনো আক্রমণাত্মক কর্মসূচিতে না যাওয়া। কারণ অতীতে এ ধরনের কর্মসূচির সুযোগ নিয়েছে সরকার। নেতারা আঁচ করছেন, রায়ের পর বিএনপি মারমুখী কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামুক, তা সরকারও চাইছে। যাতে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন চালাতে পারে।

এ অবস্থায় দলের একটি পক্ষ নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যেতে চায়। তবে আরেকটি পক্ষ দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক রায় হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর পক্ষে। তারা খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী।

যদিও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো নেতিবাচক রায়ের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে বক্তৃতা করছেন। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু করার ঘোষণা দিই বা না দিই, এমন কিছু যে ঘটবে না, সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না।’

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার গতি-প্রকৃতি দেখে কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছিল যে, রায় ঘোষণার পর বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে সরকার আগাম নির্বাচনে যেতে পারে। যাতে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নির্বাচনে যাওয়া, না যাওয়া নিয়ে বিএনপি দোটানায় পড়ে। প্রার্থিতা নিয়েও দলে বিভক্তি হয়। এই সুযোগে নতুন করে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা শুরু করা।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতে, দল ভাঙার স্বপ্ন স্বপ্নই থাকবে। তিনি বলেন, ‘নাজমুল হুদা বিএনপির নেতা ছিলেন, স্থায়ী কমিটির সদস্যও ছিলেন। ফিগার, সাইজ, পদবি—তাঁর কোনটার গুরুত্ব কম? এত বড় নেতা। তিনিও তো বিএনপিকে ভেঙে রেখেছেন। এর থেকে বড় ভাঙা আর কী হবে?’

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা জানান, তাঁদের কাছে তথ্য আছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের মতো আবারও বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা-তৎপরতা চালানো হবে। তবে এবারের প্রক্রিয়া একটু ভিন্ন বলে তাঁরা জেনেছেন। খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এরপরই দলের ভাঙন তৎপরতা দৃশ্যমান হবে। এ লক্ষ্যে বিএনপির গঠনতন্ত্র নিয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে সরকারের একটি মহল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে এবার দলের গঠনতন্ত্রের ধারা ৭ এর ‘ঘ’ সামনে আনা হতে পারে। ওই ধারায় কোনো দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য পদ বা সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার কথা আছে।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে ৭ নম্বর ধারায় ‘কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা আছে, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তাঁরা হলেন: (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮ এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘ওই রকম একটা নজির যদি এখানে সৃষ্টি করে, তা অন্য খানে করতে কতক্ষণ লাগবে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো অপচেষ্টা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে অন্যরাও এমন পরিস্থিতির শিকার হবে। সময় আসবে।’

বিএনপির নেতারা বলছেন, ৫ জানুয়ারির বিনা ভোটে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার এবারও অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক নির্বাচনের দিকে যেতে সাহস পাচ্ছে না। তাই খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখার পরিকল্পনা থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে সরকার।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •