প্রশাসন কেন ছাত্রসংগঠনের দ্বারস্থ

নিউজ ডেস্ক:: সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য রাজনৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে পদ লাভ করাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যারা প্রশাসনে আসেন কেউ যোগ্যতা বলে আসেন না। আসেন রাজনৈতিক সূত্র ধরে। ফলে তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়েও আপন হয়ে যায় ওই সব ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ছাত্র সংগঠনগুলো। নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখতে তারা ব্যবহার করেন ছাত্র সংগঠনগুলোকে।

তবে ছাত্রসংগঠনকে ব্যবহারের বিষয়টি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এসএম ফায়েজ। তিনি বলেন, অনেক সময় ছাত্র সংগঠনগুলো নিজে থেকে চলে আসে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে চার দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রথমে এই আন্দোলন সাত কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে শুরু হলেও পরে ছাত্রলীগের হামলা ও যৌন নিপীড়নের কারণে চার দফা দাবিতে পৌঁছায়। দাবিগুলো হলো- আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের করা অজ্ঞাতনামা মামলা প্রত্যাহার করা, অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, যৌন নিপীড়নকারী ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কার, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানীর পদত্যাগ এবং সাত কলেজের সংকট নিরসন।

গত ১৫ই জানুয়ারি সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি আদায়ে ভিসি’র কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে সেখানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়ে আন্দোলনরতদের নানা ভয়-ভীতি এবং মেয়েদের যৌন হয়রানি করে বলে অভিযোগ উঠে। সর্বশেষ শিক্ষার্থীরা ২৩শে জানুয়ারি আবারো ভিসি কার্যালয় ঘেরাও করে দাবি আদায়ে আন্দোলন শুরু করে। ভিসিকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন ও ঢাবি শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসানের নেতৃত্বে ভিসিকে ‘উদ্ধারের নামে’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। আবারো লাঞ্ছিত করা হয় মেয়েদের। যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সর্বত্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। তবে দুই দিনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল না। প্রশাসনে দায়িত্বরতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনজিম উদ্দিন খান। তিনি বলেন, যারা প্রশাসনে আসেন কেউ যোগ্যতা বলে আসেন না। রাজনৈতিক সূত্র ধরে তারা প্রশাসনে আসেন। ফলে তাদের দায়বদ্ধতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি থাকে না। থাকে তার দলের প্রতি। যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণ করতে পারে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সব সময় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। ড. তানজিম আরো বলেন, এটা এই সময় না। আমরা অতীতেও দেখেছি। আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন ছাত্রদলেরও একই রকম আক্রমণ ছিল। সে সময় ভিসি তাদের শেল্টার নিয়েছে। সেই সময়ের সঙ্গে এই সময়ের পার্থক্য নেই। তিনি বলেন, ভিসিকে অবরুদ্ধ করার পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো। তার একটা বড় বিষয় হচ্ছে ডাকসুর অনুপস্থিতি।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনুকূলে নেই। হলগুলোর গেস্টরুমে যে ধরনের অনাচার করে সে অনাচার এড্রেস করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মোটেই সার্চ করে না। সব ক্ষোভের প্রকাশ এর মধ্য দিয়ে ঘটলো। কারণ তাদের মত প্রকাশেরও কোনো স্পেস নেই। স্বাধীনতা নেই। যার ফলে এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারতো। এটা সম্ভব হতো বিশ্ববিদ্যালয় যদি এসব শিক্ষার্থীকে নিজেদের শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারতো। ওনারা নিজেদের অর্থাৎ ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের বাইরে কাউকেই শিক্ষার্থী মনে করেন না।

এদিকে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ভিসিকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। ২০০৫ সালের ২৮শে মে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী শাম্মী আখতার হ্যাপি রাজধানীর শাহবাগে বাস চাপায় নিহত হন। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করলে তারা চারুকলায় আশ্রয় নেয়। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা তৎকালীন প্রক্টর ড. একেএ ফিরোজ আহমেদের পদত্যাগের দাবি করেন। পরদিন তৎকালীন ভিসি ড. এসএম ফায়েজ ও প্রক্টর চারুকলা পরিদর্শনে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের অবরুদ্ধ করে দাবি মেনে নিতে বলেন। পরে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি হাসান মামুন ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ভিসিকে উদ্ধার করে। তখন শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছিল, ভিসি ছাত্রদলকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ডেকে আনেন। এ বিষয়ে ড. এসএম ফায়েজ বলেন, তিনি অবরুদ্ধ ছিলেন না। ছাত্রদলকে ডেকে আনা হয়নি। এ ঘটনার জন্য ছাত্রদলের অভিযুক্তদের বিচার হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেছে এটা প্রমাণ ছাড়া বলা যাবে না। পত্রিকায় দেখেছি। তবে এটা বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একজন ছাত্রকে পুলিশের কাছে হ্যান্ডওভার করেছে সেটা পরিহার করা উচিত ছিল। তারপর ছাত্রেদের ব্যাপারে যে কেস করা হয়েছে তা জরুরি ভিত্তিতে তুলে নেয়ার দরকার ছিল। কেস করা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি। সাবেক ভিসি বলেন, ভিসির কাছে যারা আসতে চান তাদের একেবারে ফ্রি এক্সেস থাকা উচিত। তাদের ঠেকানোর জন্য গেট বন্ধ করাকে গ্রহণ করতে পারছি না।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •