মামলা কারাভোগের কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে পারিনি : মেয়র আরিফ

নিউজ ডেক্স:: সিলেট সিটিতে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ১১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এলেও ইশতেহারের অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবায়নাধীন কাজগুলোও ঝুলে আছে।

এ ব্যাপারে আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য হল- ‘আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেও স্বস্তিতে নগর পিতার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। আলোচিত দুটি মামলায় আমাকে আসামি করা হয়। এরমধ্যে একটি সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএম কিবরিয়া হত্যা, অপরটি সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা চেষ্টা মামলা। তাই নির্বাচিত হওয়ার পর দুই দফায় আমাকে ২৭ মাস কারাভোগ করতে হয়। মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় দু’বার। এরই মধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নিই। ফলে নগরীর উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

এদিকে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও অক্টোপাসের কাছে বন্দি। একমাত্র জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে টিকে আছি। আমার কাজে অর্থমন্ত্রী সাহায্য করতে চাইলে অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা বাধা হয়ে দাঁড়ান।’

মেয়র বলেন,‘নগরবাসী আমাকে নগর ভবনে পাঠালেও উন্নয়নবিরোধী চক্র আমাকে মেয়রের চেয়ারে দেখতে চায় না। এ জন্য উন্নয়নে পদে পদে বাধা দেয়া হচ্ছে।’

জানা গেছে, এককালে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ‘ডানহাত’ হিসেবে বহুল পরিচিত আরিফ বর্তমান অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলছেন। এ নিয়ে রয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। পাশাপাশি দলের নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব ও দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতারা।

এমন আলোচনা-সমালোচনার জবাবে মেয়র আরিফ বলেন, ‘আমি নগরবাসীর উন্নয়নে দায়বদ্ধ। ঠিক সেভাবে সিলেটের মানুষ হিসেবে অর্থমন্ত্রীও। উন্নয়ন চাইলে মন্ত্রী-মেয়র সমন্বয় থাকতেই হয়। উন্নয়ন স্বার্থ ছাড়া মন্ত্রীর সঙ্গে আমার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় আমার গ্যাপের সুযোগ নিচ্ছেন কেউ কেউ। মেয়র নির্বাচনে যারা দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রতিযোগিতায় তারাই আমার বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। দলের সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব নেই। আমি বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী। এখন নেতৃত্বের চেয়ারে নেই। নগরবাসীর সেবায় ব্যস্ত থাকায় সব সময় দলীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে থাকতে পারি না।’

সম্প্রতি নগর ভবনের তিনটি গাড়ি রাতের আঁধারে ‘উধাও’ হওয়াকে কেন্দ্র করে তোলপাড় চলছে। সঙ্গত কারণে এর দায় বর্তায় বর্তমান মেয়রের ওপর। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মেয়র হেসে হেসে বলেন, এই ইস্যু নিয়ে নোংরা রাজনীতি হচ্ছে। মূলত নগর ভবনের গাড়িগুলো কাজীর কেতাবের গরুর মতো- কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই। অফিসের ফাইলে কাগজপত্র আছে কিন্তু গাড়িগুলো অস্তিত্বহীন বলা চলে। আমি দায়িত্ব নেয়ার আগেই গাড়ির ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’ কে বা কারা খেয়ে ফেলেছে! এখন গাড়ির কাগজের ফাইল নিয়ে তোলপাড় করার অপচেষ্টা চলছে।

সিলেট নগরীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে ছড়া, নালা ও খাল উদ্ধারের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। আরিফের নির্বাচনী ইশতেহারেরও অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এ ব্যাপারে মেয়র বলেন, ‘ছড়া-খাল উদ্ধারের একটি প্রস্তাবনা একনেকে অনুমোদনের পর গত বছর থেকে কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজ অব্যাহত রয়েছে। ছড়া উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সিটি কর্পোরেশন করলেও মালিকানা সিটির নয়, জেলা প্রশাসনের। মালিক যদি তার সম্পদ রক্ষায় এগিয়ে না আসে তাহলে ছড়া-নালা উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘পাবলিকের পাশাপাশি সরকারি দফতর-প্রতিষ্ঠানও নালা-খাল দখলে নিয়ে স্থাপনা তৈরি করে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ বাসাবাড়ি ও দোকানপাট ভেঙে ছড়া-নালা প্রশস্তকরণে সহযোগিতা করলেও প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছি না।’

মেয়র বলেন, ‘হলদি ছড়া ভরাট হয়ে গেছে। লিংক লাইন করার জন্য ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয় এখনও অনুমোদন দেয়নি। অথচ হাতে তেমন সময় নেই। আর মাত্র কয়েক মাস। বৃষ্টি নামলেই নালা-খাল উদ্ধার কাজ করা যাবে না। পাশাপাশি আইনি জটিলতার কারণেও অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও ছড়া-খাল উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

আরিফুল হক জানান, নগরীর ছড়ারপাড় ও মহাজনপট্টি এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। সাবেক মেয়র নালার মুখ ও লিজ দিয়েছেন দেখে আমি বিস্মিত। নালার মুখও কি লিজ হয়?

তিনি বলেন, ‘সরকারবিরোধী বলয় থেকে নির্বাচিত হওয়ায় প্রশাসনের অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা আমাকে সহযোগিতা করতে চান না।’ ছড়া-খাল উদ্ধারের পাশাপাশি সুরমা নদী খননের দাবি তুলেছেন মেয়র আরিফ।

তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০০ বছরেও সুরমা নদী খনন হয়নি। ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে একটু পানি হলেই সুরমার পানি উপচে নদী তীরবর্তী সিলেট নগরী প্লাবিত হয়। এ ব্যাপারে প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছি। কারণ সুরমা উপচে নগরীতে পানি ঢুকলে নালা-খাল উদ্ধার করেও জলাবদ্ধতা শতভাগ নিরসন করা যাবে না। নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যা ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে হকাদের অবস্থান। বারবার উদ্যোগ নিয়েও এতে শতভাগ সফল হতে পারেননি মেয়র আরিফুল।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হকার সমস্যা নিরসনের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় তা শেষ করতে পারছি না। এছাড়া হকার উচ্ছেদে যেখান থেকে গ্রিন সিগন্যাল আসার কথা সেখান থেকে আসছে না। খোদ প্রশাসনই দায়িত্বহীন। নগরীতে হকার পুনর্বাসনের নামে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ করে হকার মার্কেটের নামে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের অন্ধকার আস্তানা করা হয়েছে অতীতে। উন্নয়নের নামে এগুলো এখন গলার কাঁটা। সাবেক মেয়র সিটি কর্পোরেশনের ভূমি বিক্রি তো করেছেনই, আকাশও বিক্রি করে দিয়েছেন। হাসান মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এটা ভালো জানেন।’

নির্বাচনী ইশতেহারের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মেয়র বলেন, ‘আমার কর্মপরিকল্পনা ছিল তিন স্তরের। দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্প মেয়াদি। কিন্তু দায়িত্ব নিতেই মিথ্যা মামলা, বরখাস্ত, কারাবরণ, পদে পদে উন্নয়নে বাধার কারণে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নগরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা। এজন্য চেঙ্গের খাল নির্ভর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য বিশাল অংকের টাকার প্রয়োজন। এই প্লান্ট বাস্তবায়ন করা গেলে প্রায় ১০০ বছর নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির জন্য আর টেনশন করতে হবে না।’

আরিফুল আক্ষেপ করে বলেন, সিলেটের চেয়ে পিছিয়ে থাকা অনেক সিটি কর্পোরেশনে স্যুয়ারেজ লাইন রয়েছে অথচ সিলেটে নেই। স্যুয়ারেজের জন্য আবেদন পাঠিয়েছি। অর্থ চেয়েছি অর্থমন্ত্রীর কাছে। স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা হলে নগরীর ছড়া, নালা ও খালে আবর্জনার ভাগাড় হবে না। নষ্ট হবে না পানি। তিনি জানান, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ শুরু হবে। এটা হলে সিলেট পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে।

আপনার প্রতিপক্ষ কে- এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ বলেন, ‘নির্বাচনে যিনি পরাজিত হয়েছেন তিনিই আমার প্রতিপক্ষ।’ আগামীতে নির্বাচন করবেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন করব যদি দলীয় মনোনয়ন পাই, নতুবা নয়।’

আরিফুল আরও বলেন, ‘সিলেট শহর ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এরপর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য হই। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাই। ওখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক হই। দেশে ফিরে প্রথমে বিএনপির সদস্য, এরপর পর্যায়ক্রমে জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক, সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। তারপর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, সভাপতি, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হই। বর্তমানে সিলেট মহানগর ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হিসেবে আছি।’

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ২৩০ ভোট।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •