“ফিক্সিটি অফ পারপাস” (Fixity of purpose)

নিলয় গোস্বামী:-

(গল্প)

যাক,সে দিনটা ছিল রুদ্রের মনে রাখার মতো।লুক্কায়িত ইচ্ছের উপযোগ ও বটে। এমনই বুঝি জীবনে সহসা ঘটে।

রুদ্র ওদিক থেকে খবর পেলো কলকাতার এক আত্নিয়, তার শুভ পরিণয়ের পূর্ণতার আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আলাপচারিতায় জানতে পারলো অষ্টাদশী তরুণী, সদ্য চান্স পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

কৌতুহলি মন মানেনা বারণ ;ঢুঁ মেরে ইন্সটাগ্রাম টা চোখবুলিয়ে নিলো।
প্রোফাইল টা চোখে পড়তেই নাম ভেসে উঠলো

প্রিথুলা!

প্রিথুলা সেনগুপ্তা।
ওমা!

এ যে যথেষ্ট স্মার্ট!
উত্তর আমেরিকার তুষারাবৃত আধুনিক নগরীতে যথেষ্ট মানানসই হবে যে!
বেশ পছন্দের সাথে “প্রিথুলা” নামটি রুদ্রের মুখে প্রথম বারের মতো উচ্চারিত হলো।

একঝাঁক বন্ধুদের মাঝে নিজেকে সে ফোকাস করছিল।
হাসিতে অজস্র আবেদন খেলা করছিল ;যা মাতাল প্লাবনে ভরেদিতে পারে যে কোনো তরুনের হৃদয়।

বেচারা রুদ্র যদিও আধুনিক বিশ্বে বাসিন্দা কিন্তু স্বভাবে আচরণে সে পাক্কা বাঙালি এবং মার্জিত পুরুষ বটে।

নিজেকে ক্যাসিনো থেকে মন্দীরেই বেশি মানানসই ভাবে।

সাদাচামড়ার মিনি পোষাকে অভ্যস্ত মেয়েরা এ নিয়ে ইউনিভারসিটিতে অনেকবার তাকে ব্যঙ্গ করেছে।

রুদ্রের অবশ্য এতে কিছুই যায় আসেনা ;কারণ সে নিজের আদর্শ আর রুচির জন্য অন্যের খুনসুটির পরোয়া করেনা।

এ যে গেলো রুদ্রালাপ,

এখন প্রিতুলা-রুদ্রের
বাক্যালাপের শুরুতেই ঘটলো অনবদ্য বিড়ম্বনা।বিষয় টা পারিবারিক ভাবে প্রিথুলা জেনে গেলো।

রুদ্রের বিষয়ে আগেই সে প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে,এতে রুদ্রের কনের সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাতে,জটিলতাপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হলো;যার পরিণাম রুদ্র কে বেশ চড়াদমে দিতে হয়েছিল। প্রিথুলার জন্য রুদ্র বিষয় টা ছিল একটু বাড়তি শিডিউল”স্কেজিউল ম্যানেজমেন্ট।

এটা অবশ্য তার নৈমিত্তিক ঘটনা।

প্রিথুলা তো ,দেহে- মনে মজে আছে ইমতিয়াজ রাহী (শুভ) এর সাথে। বছর তিনেক আগে থেকেই তাদের প্রেম চলছে।

তাদের প্রেম বিন্দু বিন্দু জল থেকে এখন সাগরের পরিধিরেখার মতো ব্যাপ্ত হয়েছে।
পেয়েছে পূর্ণতার আবেশ।

মেয়েটার বয়সের চেয়ে প্রেমিকা সাজবার মানসিক পরিপক্বতা ছিল সম্ভবত কয়েক গুণ বেশি: যা আটাশ বছরের যুবতীদের ও পিছনে ফেলে যায়।

রুদ্র কল্পনাতে মিস সেনগুপ্তার জলছবি আঁকছে মিসেস রুদ্র বানাবে বলে।

বন্ধুদের আড্ডাতে ছবিও দেখানো শেষ। স্কাইপ চ্যাট শুরু।

হাই,
আমি রুদ্র,
রুদ্র চৌধুরী।
উত্তর আমেরিকায় থাকি।

প্রিথুলা :জানি

রুদ্র:জানা আছে বুঝি!!!
প্রিথুলা:হ্যাঁ, কানাডার মন্ট্রিয়ালে থাকেন।
রুদ্র:এক দমঠিক।
প্রিথুলা:স্কাইপে আসার কারণ জানতে পারি?
রুদ্র: নিশ্চয়, কেনো না? নিজেকে দেখাতে কিংবা দেখার ইচ্ছে থেকে।
প্রিথুলা:দু’টুতেই অনিন্দ্য আনন্দ পেয়েছেন ;না কি দেখিয়েই সুখ কুড়িয়েছেন?
রুদ্র:নিজেই বুঝতে পারবেন, সময় কে আপন গতিতে হাঁটতে দিন। প্রথম দিনের আলাপ চারিতায় রুদ্রের সংসার রচনার স্পৃহা এক ধাপ আগিয়ে নিয়ে গেলো। চাইলো প্রতিদিন ই স্কাইপ রান করবে। কিন্তু বাধা আসলো অন্য জাগায়।

ব্যক্তিত্ববান পুরুষেরা নিজের ইচ্ছেটাকে, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিত্বের ভারে পৃষ্ট করে থামিয়ে দেয়: রুদ্রের ক্ষেত্রে ও তেমনটি হয়েছিল। নিজেথেকে আর সেধে স্কাইপ করলো না।

প্রিথুলার স্বভাবের দোষের অভাব ছিলোনা। দু’দিনেই মোটামুটি দেশে শুভ কে সময় দেবার জন্য টাইম সিডিউল সহ সব কিছুর আপাতত পরিচ্ছন্ন ইতি টেনেছে । বিদেশে রুদ্রের সাথে কথাবলার সময় টাকেও বেশ করে গুছিয়ে নিয়েছে।

রুদ্র তো অপেক্ষা করছে তার ফোনের। ব্যক্তিত্ববান পুরুষ না পারছে সেধে হ্যালো দিতে; না পারছে আলাপ না করে থাকতে। যাক, তার মনের ইচ্ছে পূর্ণতা পেয়েছে। প্রিথুলার হ্যালো পেয়ে গেলো।

শুরু হলো আলাপ। পরের দু’দিনের মিনিট ত্রিশেক আলাপে রুদ্র একটু হোঁচট খেলো।
নীরবে ভাবলো ও এতো তাড়াতাড়ি কেমন করে ইনফরমাল আলাপে জড়িয়ে পড়ছে!!

আমার তো বেশ বাধছে ওর কথার উত্তরে মজে যেতে। রুদ্র ইমপারসোনাল আলাপেই বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে; অন্যদিকে প্রিথুলা করছে পারসোনাল আলাপে।

রুদ্রের মনে ভাবনার বাষ্পদল ঘোরপ্যাঁচ কাচ্ছে। প্রিথুলা কী এতে অভ্যস্ত না আমায় পরখ করে দেখছে!

আবার মনে মনে বলছে না তৃতীয় বিশ্বের লোকজন রক্ষণশীল হয় বেশি। ওসব কিছু না।

রুদ্র বেচারা কাশিরাম আর হোমারের সাহিত্য নিয়ে ওর সাথে আলাপ শুরু করে ;
প্রিথুলা চলে যায় ভ্লাদিমির নবোকভের লেখার বেড়াজালে।

রুদ্র প্রিথুলার কথায় ইনিয়েবিনিয়ে দাড়ি দেয়; ঘুরে আসে সে তার পছন্দের সাহিত্য আলাপে।

বার বার চাইছে প্রিথুলার মানসিক ধরণ আর পর্যায় বুঝতে। আলাপ করতে চাইছে পজেটিব ফিলসফি নিয়ে।

রুদ্র:তুমি “দ্যা রিমেইন্স অব দ্যা ডে” কুজো ইচিগুরো লেখা বইটি পড়েছো?

প্রিথুলা:না

রুদ্র:”ফোক ডেভিলস অ্যান্ড মোরাল পেনিক্স” স্টানলি কোহেনের লেখা।
পড়েছো এটা?

প্রিথুলা:না
রুদ্র:”জেন আয়রে” শার্লোট ব্রুটনির লেখা এটা। পড়েছো?
প্রিথুলা:আরে না,এইগুলা নাম শুনিনি।দাঁড়াও দেখি আমি যেগুলো পড়েছি তুমি পড়েছো কী না?
মিলেগেলে বুঝবো আমারা দুজন একরকম পছন্দের ই পাঠক।
প্রিথুলা: অ্যানিস নিন এর “ডেলটা অব ভেনাস” পড়েছো?

“হাউজ অফ হোল্স” নিকলসন এর লেখা। পড়েছো?
“দ্যা লাভার” ম্যার্গারেট ডুরাস এর লেখা।
পড়েছো?
এই ইরোটিক নোবেল গুলো আমার ভালো লাগে।
রুদ্র :রুদ্র তো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে শুনে!
চুপচাপ ভাবছে এতো ইরোটিক নোবেল এই বাঙালি মেয়ে পড়ে কী ভাবে!!

কিছু সময় চুপ থেকে বলে “দ্যা লাভার” কিছু পাড়েছি পরে আর ভালো লাগেনি।
ভীষণ অমার্জিত গল্পের নোবেল তাই আর পড়িনি।

প্রিথুলা: এই জন্যেই তুমি আমার সাথে আলাপে অনেক অগোছালো।
প্রিথুলার কথার ভিন্নরূপ আর কৌতুক রসবোধ ছিলো যেকোনো মানুষকেই প্রভাবিত করার মতো।
ইনফরমাল বাক্যালাপে যে কোনো তরুণকে নাক ডুবিয়ে পাম ওয়াইন খাইয়ে মাতাল করতে পারবে।
রুদ্র বেচারা ভেবেই বসে আছে-আমি যেহেতু মিনি পোশাক ওয়ালা কান্ট্রির লোক ;তাই প্রিথুলা আমায় পরখ করছে। প্রিথুলাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের দৃঢ়তায় রুদ্রের কোনো কমতি ছিলনা।
রুদ্রের ভালোবাসায় ফিক্সিটি অফ পারপাস স্ফুলিঙ্গ হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছিল। এক মাস পর রুদ্র দেশে আসলো। আসার পরের দিনই পারিবারিক ভাবে দু’জনের দেখার আয়োজন হলো।

নিজেকে বেশ পরিপাটি করে সাজিয়ে নিয়েছিলো প্রিথুলা। রুদ্র বেচারা প্রিথুলাকে দেখেই কুপোকাত।

প্রিথুলাকে অন্যদের কাছে একটু অভারএক্সপোজড মনেহবে; কিন্ত রুদ্র তা টেরই পায়নি।
রুদ্রের বিচক্ষণ চিত্ত তখন প্রিথুলার রুপের ইন্দ্রজালে সম্মোহিত; তাই সূক্ষ্ম পরীক্ষণকার্য গোল্লায় গেলো!

দুজনের মধ্যে নিবিড় ঘেঁষাঘেঁষি বাঁধভাঙা নদীর মতো বয়ে চললো। এদিকে সময় চলেগেছে প্রায় দিন দশেক। বিপত্তি ঘটলো ইউনিভারসিটির অনুষ্ঠানে।

প্রিথুলা ভালো নাচতে পারে। ভার্সিটি তে তার বেশ জনপ্রিয়তা ও আছে।
বরাবরের মতো সে দিন তার স্টেজ শো ছিলো।

রুদ্র ছিলো অনষ্ঠানে প্রিথুলার কাঙ্ক্ষিত অতিথি আর ইমতিয়াজ রাহী (শুভ) অনাকাঙ্ক্ষিত।
দুজন গেলো দেখতে। শুভ যে আসছে ভার্সিটি তে প্রিথুলা তা দেখতে পায়নি।

প্রেমালাপের কোনো এক ফাঁকে শুভ কে সে বলেছে ভুলেগিয়ে ছিল। স্বভাবের দোষের শাস্তি বড়ো বিচিত্র; কে কখন ফেঁসে যায় কেউ জানেনা। নাচ শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রিথুলা স্টেজ থেকে নেমে গ্রিনরুমের পর্দার ছায়া ঘেঁষা কোণে চলে যায়।

শুভ প্রিথুলাকে বরাবরের মতো ঘনিষ্ঠ অভিবাদন জানাতে চিরো চেনা জাগায় চলে আসে।
এর আগেই রুদ্র পৌছেগেছে ওখানে।
ঘটলো মহা প্রলয়। শুভ গিয়ে দেখে তার অভিবাদন অন্য আরেকজন উষ্ণতর করে জানাচ্ছে।

শুভ এমনিতেই রগচটা, বখাটে। সে দৌড়ে গিয়ে সিনক্রিয়েট করে বসলো। শুরু হলো প্রিথুলা জিজ্ঞাসা পর্ব।

শুভ জোর করে রেখে দিলো প্রিথুলাকে, বললো আমি তোমাকে বাসায় পৌছে দেবো।

রুদ্র জিজ্ঞেস করলো প্রিথুলাকে, সে এই লোকটিকে চিনে কি না। প্রিথুলা উত্তর দিলো, তুমি বাসায় চলে যাও আমি অনুষ্ঠান শেষে চলে আসবো।

রুদ্র বাধ্য হয়ে বাসায় চলে আসলো। ভাগ্যিস গ্রিনরুমের এই স্থানটি মানব শূন্য আর অন্ধকার ছিলো;
তাই ভার্সিটিতে বিষয় টি জানাজানি হয়নি। এই ফাঁকে শুভ সব জেনে নিলো প্রিথুলার কাছথেকে।

শুভর মতো বখাটে ছেলেদের যা আচরণ করার কথা তাই প্রিথুলার সাথে করলো। “জান” ডেকে বুকে নিলো আবার চড় -থাপ্পড় ও দিলো। এবার রুদ্র বিচক্ষণ পুরুষের মতো আচরণ করলো।

এই সময়ের মাঝে সে দুই পরিবারের কাউকে জানালো না। মূল বিষয় টা প্রিথুলার কাছ থেকে জানতেই অপেক্ষা করলো।

বিকেল থেকেই ফোনে, মেইলে সব ধরণের যোগাযোগ মাধ্যামে প্রিথুলার কাছে পৌছাতে চেষ্ঠা করলো।

প্রিথুলা একদম নীরব থাকলো, কোনো উত্তর দিলো না। রুদ্র কিছুই দুই পরিবারের কাউকে বললো না। চিন্তা করল কাল সরাসরি দেখা করবে।

সকালে বাসায় গেলো দেখলো বাসায় নেই। পরে গেলো ইউনিভারসিটিতে, সারাদিন সেখানেই ছিলো কিন্তু পেলো না।

পরে শেষে বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকলো। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে; দেখলো প্রিথুলাও আসছে।

রুদ্রকে দেখেই একটু দৃষ্টিতে ব্রেকফেল করলো সে। বেশ সাভাবিক হতে চেষ্টা করে বললো: রুদ্র তুমি এখানে কেনো? বাসায় চলো।

বেশ সাবলিল ভাবে পুরো ঘটনাকে ধামা-চাপা দিয়ে অন্য দৃশ্যের অবতারণা করতে চাইলো।

চুপ করে রুদ্র জিজ্ঞেস করলো কোথায় ছিলে তুমি?
প্রিথুলা উত্তর দিলো, কেনো ভার্সিটি তে!

বাহ্! সারাদিন আমি তোমার ভার্সিটি তে ছিলাম। ডিপার্টমেন্টের সামনেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ক্লাসের বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছি; তোমার ক্লাস কখন শেষ হবে?

ওরা বলেছে তুমি ক্লাসে আসোনি। আমার ফোন থেকে শুরু করে যাবতীয় যোগাযোগ মাধ্যমে তুমি রিপ্লাই কেনো দাওনি?

প্রিথুলা সাথে সাথেই বলে বসলো :আমার না- সেলফোন ডিভাইস টা নষ্ট হয়ে গেছে।
আমি কিছুই করতে পারছিনা; তাই বাসায় রেখে দিয়েছি।

রুদ্র একটু চুপচাপ চিন্তা করতে লাগলো। হঠাৎ প্রিথুলার পার্সে রিং বেজে উঠলো। রুদ্র বললো প্লিজ পিক আপ দ্যা ফোন। স্পিকার বাটন অন করো। বাধ্য হয়ে সে তা-ই করলো।

আর সাথে সাথেই শুভ শুরু করলো বাসায় সারাদিন সময় কাটানোর স্মৃতি,
আর এখন সে একা আছে এই অনুভূতি মেশানো কথার ফুলঝুরি।
রুদ্র বলল তোমার ক্লাস কি এরকম প্রায় ই ভার্সিটি থেকে বাসায় চলে যায়?

শুভ ফোনে সব শুনতে পেলো আর বখাটেপুরাণ পাঠ করতে শুরু করলো। প্রিথুলার বিষয়ে রুদ্রের যা জানার,সব জানা হয়ে গেলো এই সুযোগে।

রুদ্রের প্রতি প্রিথুলার অবস্থানের কথা রুদ্র জানতে চাইলো। প্রিথুলার সারাদিনের শুভর কাছথেকে পাওয়া ঘোর কাটেনি।

বাহানা বানানোর আর কোনো রাস্তা ও নেই, তাই বললো যা শুনেছো সব সত্যি। শুভকেই আমি ভালোবাসি, ওই আমার সব কিছু। শুভ স্পিকারে বলে উঠলো এই হাবড়া কে তোমার জীবন থেকে চলে যেতে বলো;না হয় প্লেনে হুইলচেয়ারে করে উঠতে হবে আর, সারা জীবনের জন্য ওটাকেই সঙ্গি বানিয়ে দেবো।

প্রিথুলা বলে বসলো,
শুনেছো তো?তোমার সাথে অভিনয় করেছি। এবার শুভ আর আমাকে শান্তি তে থাকতে দাও। এই কথাগুলো অবশ্য শুভকে মেকি প্রেম প্রমাণের খাতিরেই সে বলেছিল।

যথেষ্ট ভদ্র,শান্ত,ন্ম্র স্বভাবের ব্যক্তিত্ববান সুপুরুষ রুদ্র।
কোনো কথা বলতে পারলো না; শুধু রাগে ঘৃণায় কষ্টে মনে মনে বলতে লাগলো পৃথিবী তুমি দু’ভাগ হও, আর আমাকে এখন ই তোমার মাঝে অদৃশ্য করেনাও।

এতো অপমান নিয়ে মানুষ তো দূরের কথা; ইট পাথরের কণা,গাছের পাতা,চেনা-অচেনা গলিপথ কেও আমি মুখ দেখাতে পারবো না।

রুদ্রের চুপথাকাতে প্রিথুলা বললো হাবড়া এবার বিদায় হও; আর আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও। ঠিক তখন রুদ্র বললো একটি কথা বলে যাই আর
শুনেরেখো :”সত্যিকারের ভালোবাসায় ঠকানো বলতে কিছু থাকেনা;বরঞ্চ ঠকে যাওয়ার মহাকাব্য জন্ম নেয়”।

ভালোবাসি তো তাই অভিশাপ দিতে পারলাম না। প্রকৃতি যেন তোমায় ক্ষমা করে দেয়।
সময়ের কাছে যেন তুমি হেরে না যাও। আফসোস আমায় চিনলে না,এখনো ছিঁড়ে যাওয়া আমি টাকেও অনুভব করলেনা!!

রুদ্র নিজের অস্তিত্বকে আর টিকিয়ে রাখতে পারলো না। মনের পীড়ায় আক্রান্ত হলো।
বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজন আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে কানাডা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে চলে গেলো। এক উন্মাদ রুদ্রকে নিয়ে তারা মন্ট্রিয়ালে ফিরে আসলো।

উন্নত বিশ্ববের ডাক্তাররা রুদ্রের পীড়ার বিবরণ দিলো “সোমনামবুলিজম” আর “একটিভ ডিলিরিয়ম” ;এই দুই পীড়ায় আক্রান্ত এক উন্মাদ তরুণ সে।

রুদ্রকে ভর্তি করা হলো ডগলাস মেন্টাল হাসপাতালে। প্রফেসর ডাঃ জনাথন পেটরালজিয়ার আন্ডারে চিকিৎসা চললো। সহকারী ডাক্তার ছিলেন ডাঃ অরুণিমা সান্যাল। মানসিক আঘাত এতোটাই গুরুতর ছিলো যে ডাক্তাররা ঘাবড়ে গিয়েছিল রুদ্রকে সুস্থ করতে।

অনেক কষ্টের ফলে রুদ্রকে প্রায় এক বছরের বেশি সময়ে ডাঃ জনাথন ও ডাঃ অরুণিমা নিজস্ব যত্নে সুস্থ করে তুলেন।

রুদ্রের শিশুসুলভ আচরণ, জেদ,অন্যায় আবদার,সবকিছুর দেখভাল এই একবছর- বেশিরভাগ সময় ডাঃ অরুণিমাই করেছেন। রুদ্রের যতো সমস্যা সবকিছুর ফুলফিলমেন্ট করতেন অরুণিমা।

সুস্থ রুদ্রকে ডাঃ অরুণিমা খুব কাছথেকে অনুভব করলেন।
ব্যক্তি রুদ্র ডাঃ অরুণিমার হৃদয়ে দাগ কাটতে লাগল।

ভালোবাসা আর অনুভবে রুদ্রকে জীবন সাথি হওয়ার উপযুক্ত পুরুষ রুপে কল্পনা করলেন ডাঃ অরুণিমা।

নিজের ভালোবাসা ও অনুভবের কথা রুদ্রকে আবেগ জড়িত কণ্ঠে জানান দিলেন ডাঃ অরুণিমা।
ডাঃ অরুণিমা যথেষ্ট সুন্দরি, ঈশ্বর বিশ্বাসী আর কোমল হৃদয়ের নারী।
রুদ্র তার জীবনের এক বছরের খসেযাওয়া সোনালী সময়ের কথা জানলো।
অরুণিমার যত্ন, চিকিৎসা, সেবা,ভালোবাসার কথা অনুভব করলো।
অরুণিমার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা যাইহোক,যে কারণেই হোক রুদ্রের হৃদয় অরুণিমার প্রস্তাবে সাড়া দিলো। দুজনের সুখী দাম্পত্য জীবন রচিত হলো।

প্রিথুলাকে ঠিকই প্রকৃতি ক্ষমা করলো না। শুভ নিজেও প্লেবয় টাইপের ছেলে ছিল।
নিজের সামগ্রীক প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর সে অন্য মেয়েদের সাথে জড়াতে লাগলো।

এই বিষয় গুলো প্রিথুলা টের পেতে লাগলো আর তার কষ্টের বোধের পালা শুরু হলো।
শুভকে কঠিন ভাষায় প্রিথুলা জিজ্ঞেস করল সাম্প্রতিক বিষয়ে।
শুভ উত্তর দিলো তুমি যেরকম, সেরকম করে স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে নাও বিষয় টা।
রুদ্রকে যে ভাবে বলেছিলে, তুমিও স্বাভাবিক ভাবে নিয়ে নাও বষয়টি।

আমার আজ অন্যজনের সাথে দেখা করার কথা তোমার নাবলে বাসায় এভাবে আসা ঠিক হয় নি,সে দেখলে মাইন্ড করবে। আমাকে বাড়তি ঝামেলায় ফেলার কী দরকার?
চলে যাও।

চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করলো প্রিথুলা, আর বলতে লাগলো তাদের চার বছর ছয় মাসের সম্পর্কের কথা। শুভ এই সব আমলে নিলোনা।

সে এই সব আমলে না নিয়ে কুকুরের মতো প্রিথুলাকে তাড়িয়ে দিলো।
আর যাচ্ছে তাই বখাটেপুরাণ পাঠ করলো।

বাসায় আসতে আসতে প্রিথুলা ভাবতে লাগল কী ক্ষতি করেছে শুভ তার সাথে!
চামড়ায় ঢাকা হৃদয়ের বাহির-ভেতর শুভ নিজের মতো করে চাষাবাদ করেছে।
কিছুই তার অবশিষ্ট নেই। শূন্য পাত্র হয়েগেছে সে।

পৃথিবীতে অচল পয়সার চেয়েও কমতি লাগছে নিজেকে। বুকফাটা যন্ত্রণার আগুনে দগ্ধহয়ে, অনুভব করতে লাগলো,রুদ্র নামের কোনো কালের তুচ্ছার্থে ফিরিয়ে দেয়া মানুষটাকে।
হাজার চেষ্টা করে কোনো রকমে রুদ্রের মায়ের ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফোন দিলো।

পরিচয় পেয়েই রুদ্রের মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এই ফাঁকে কাঁদতে কাঁদতে প্রিথুলা সব বলেদিলো। নিজের ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের ক্ষমা ভীক্ষা চাইলো।

রুদ্রের মা ভৎর্সনার জন্য অনেক শব্দ গুছিয়ে ছিলেন; কিন্তু প্রিথুলার করুণ অবস্থা তাকে বলতে দিলো না।

হাজার হোক তিনিও তো মা, তাই কষ্টদায়ক কোনো উক্তি না করে,শুধু রুদ্রের বিয়ের খবর টা দিলেন।

রুদ্রের মানসিক হাসপাতালে এক বছর থাকার খবর টা দিলেন ;আর বললেন :যে ডাক্তার মেয়ে তাকে সুস্থ করেছে সেই এখন তার বৌমা।

তোমর কাছে একটা মিনতি করি,তুমি ভুলেও আমার রুদ্রের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করোনা।

আমার ছেলের নতুন জীবন দিয়েছে এই মেয়ে;তার জীবন আমি ধ্বংস করতে পারবো না।
নিজেকে আর বিপথগামী করোনা। এখনো সময় আছে, ভালো ভাবে বেঁচে থাকার পথ বেছে নাও। ফোন ডিসকানেক্ট হয়ে গেলো।

প্রিথুলার চারিত্রিক অধঃপতন তার ভার্সিটি ক্যারিয়ারে ও ভীষণ প্রভাব ফেললো,সে গ্রাজুয়েট হতে পারলো না।

প্রিথুলারা এমন ই হয়।
স্বভাবের দোষে আক্রান্ত মানুষ চাইলেই কী নিজেদের চারিত্রিক অধঃপতন থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারে?
কিতাবে লেখা পৃথিবীর মহামানবদের বানী গুলো এরা একবারো ভেবে দেখেনা।

“চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ”
“নারী হলো মায়ের জাতি,প্রজন্ম এদের কাছ থেকেই চারিত্রিক শিক্ষা পায়”
“আমায় একটি সুশিক্ষিত মা দাও আমি একটি সুশিক্ষিত জাতি উপহার দেবো”সএই তাৎপর্য পূর্ণ উক্তি গুলো প্রিথুলাদের কাছে বুলশিট ছাড়া আর কিছুই নয়। একটি সুখী পরিবার,সুষ্ঠু সমাজ,সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়তে গেলে মানুষ কে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠাচাই।

প্রিথুলাদের প্রেম শুভদের সাথে ইতরপনার নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়;পরিণামে আফসোসের সুযোগ ও থেকে যায়না। মানুষ বড়ো বিচিত্র প্রাণী, শুধু জন্ম নিলেই মানুষ হয়ে ওঠতে পারেনা।

প্রকৃত আচরণের মাধ্যমেই পরিপূর্ণ মানুষ প্রত্যয়ের প্রমাণ দিতে হয়;এখানেই মূলত অন্য প্রাণীকুলের সাথে মানুষের ভিন্নত্ব।

অভিন্ন সমান্তরাল পৃথিবীতে মন্দ আর চিরন্তন সত্য এই দুই এর মাঝে নিজেকে সত্যে সতন্ত্র করতে হয়;তবেই মানুষের আকৃতি, বৈশিষ্ট ও অবস্থানের পূর্ণতা পায়।

প্রিথুলা সংলাপের অনুভব, চিন্তার গাঁয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর বেনামি আফসোস লিখে দিয়ে যায়। প্রিথুলার নিজস্বতার বোধদয় হচ্ছে তার একমাত্র মুক্তির পথ।

এই অভিন্ন সমান্তরাল পৃথিবীতে সে প্রিথুলাদের স্বভাব দোষের পথে, না কী
সত্যের পথে,শৃঙ্খলার পথে চালাবে; সেটা তার আচরণই আগামী সময়কে জানান দিবে।

শুধু দাগ থেকে গেলো অম্লান স্মৃতিতে ধোয়া সোনালী দিনের গাঁয় ;
শূন্যতাকে যে প্রসব করেছে স্বেচ্ছায় সেখানে পূর্ণতার অধিজনন বড়ো দায়………

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •