কেমন গেল বিএনপির ‘২০১৭’সাল?

নিউজ ডেক্স::  দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েক বছর ধরেই চলছে টানটান উত্তেজনা। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে পরস্পর বিরোধিতা। আর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঁদা ছোড়াছুড়ি বক্তব্যে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে শঙ্কা ও সংশয়।

চলতি বছরের শুরু থেকেই ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। অনেকটা ঘরোয়া রাজনীতিতে সীমিত থাকা দলটির দাবি- হামলা, মামলা, গুম ও হত্যার পরও বছরের শেষের দিকে এসে বেশ কয়েকটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে তারা। লক্ষ্য ‘জনগণের সরকার’ প্রতিষ্ঠায় একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায় করা।

বছরের শুরুতে কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ:
বছরের শুরুতে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলই মুখোমুখি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়ায়। ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা্ দিবস’ উপলক্ষে ‘কালো পতাকা মিছিলের’ কর্মসূচি দেয় বিএনপি। এ উপলক্ষে সমাবেশ করতে চেয়ে অনুমতি না পেয়ে সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক দেয় দলটি।

নতুন ইসিতে বিএনপির আপত্তি:
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যেমে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচন কমিশন ঘোষণা হলে তাতে আপত্তি জানিয়ে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদার পদত্যাগ চায় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো।

কুসিক নির্বাচনে বিএনপির জয়:
মার্চে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু বিজয়ী হন। এই জয়ে বিএনপির আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগে। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মনিরুল হক পান ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মেয়র পদপ্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৭৬৩ ভোট।

ঢাকা মহানগরে বিএনপির নতুন কমিটি:
সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের পর এই বছরের ১৯ এপ্রিল ঢাকা মহানগরে নতুন নেতৃত্ব আনেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার ‘ভিশন -২০৩০’ চমক:
বছরের মাঝামাঝিতে এসে গত ১০ মে বিএনপির ভিশন-২০৩০ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন খালেদা জিয়া। তার ৪১ পাতার বইয়ের এই ভিশন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে ‘স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক’ শাসনের জন্ম দিয়েছে দাবি করে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যামে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার কথা বলেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

তছনছ খালেদার কার্যালয়:
খালেদা জিয়া বিএনপির ভিশন-২০৩০ তুলে ধরার দশদিন পর গত ২০ মে তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। ‘রাষ্ট্র বিরোধী ও আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থী নাশকতা সামগ্রীর খোঁজে’ পুলিশ গুলশানে বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। অফিসটি ‘তছনছ করা’ হয়েছে অভিযোগ করে তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘অভিযানে পুলিশের প্রাপ্তি শূন্য’। অর্থাৎ তারা কিছুই পায়নি। পুলিশও এটি স্বীকার করেছে।

খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর ও উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা:
হাটু ও চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। সেখানে সপরিবারে আছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তার বড় ছেলে তারেক রহমান। গত ১৫ জুলাই লন্ডন গিয়ে প্রায় তিন মাস সেখানে অবস্থান শেষে ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন খালেদা জিয়া।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ:
বছরের শেষ দিকে ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। বৈঠকে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং সব দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায় বলে জানান সুষমা স্বরাজ।

রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে উখিয়ায় খালেদা:
বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কক্সবাজারের উখিয়া যান রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে; যারা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।

গত ২৮ অক্টোবর উখিয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা দেন খালেদা জিয়া। মাঝে চট্টগ্রামে যাত্রাবিরতি দিয়ে ৩০ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়া যান বিএনপি নেত্রী। সঙ্গে নিয়ে যান ৪৫ ট্রাক খাদ্যাপণ্য। উখিয়া যাওয়ার দিন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা হয়। এতে বহরে থাকা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যামের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিয়ে ফেরার পথেও গাড়িবহরে হামলা হয়। ওই সময়ে রাস্তায় দাঁড়ানো দুটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনায় সরকারকে দায়ী করে বিএনপি।

উখিয়া সফরে নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফুর্ততায় মুগ্ধ বিএনপি নেতারা:
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দর কষাকষিকে সামনে রেখে খালেদা জিয়ার ওই উখিয়া সফরে বেশ ‘স্বতস্ফূর্ততা’ দেখান স্থানীয় জনগণ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা। যা বিএনপিকে আত্মবিশ্বাসের রসদ দিয়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

বছরের শেষে দীর্ঘদিন পর মাঠে বিএনপি:
দীর্ঘদিন ঘরোয়া রাজনীতিতে সীমিত থাকা বিএনপি বছরের শেষ দিকে এসে সমাবেশের মতো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ পায়। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত ১২ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে বিএনপি। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি ডিঙিয়ে ঢাকায় বিএনপির জনসভায় নেতাকর্মীদের ‘ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত’ আর উচ্ছ্বাসের চিত্র নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দলটিকে। সমাবেশে প্রত্যাাশার চেয়েও বেশি সাড়া এসেছে দাবি করে দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের এক ধরনের প্রতিবাদ।

‘উভয় সংকটে’ বিএনপি:
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের নিয়ে প্রায়ই উভয় সংকটে পড়ে দলটি। জোটের বেশ কয়েকটি দলের মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়ার পর ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে যাওয়া ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এ বছরও জোটের দুই দল লেবার পার্টি ও জমিয়তে উলামায় ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে যায়। এর আগে যে শরিক দলগুলো ভেঙেছে তার একটি অংশ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও অন্য অংশকে জোটেই থাকতে দেখা গেছে। তবে এবার লেবার পার্টি ও জমিয়তে উলামায়ে দল দুটি ভেঙে গেলেও কোনো অংশই জোট থেকে বেরিয়ে যায়নি। বরং দলগুলোর দুটি অংশই জোটে থাকতে চাইছে। এ নিয়ে এক প্রকার উভয় সংকটে রয়েছে বিএনপি। যদিও এই বিষয়ে ধীরে চলো নীতিতে রয়েছে জোটের প্রধান দল বিএনপি।

‘২০১৭’তে যাদের হারিয়েছে বিএনপি:
এ বছর বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের নেতাকে হারিয়েছে বিএনপি। বছরের শুরুতে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হুদা, হারুন অর রশিদ খান মুন্নু, সঞ্জিব চৌধুরী, মো. আখতার হামিদ সিদ্দীকী, বছরের শেষ দিকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান বিএনপির নীতি নির্ধারনী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ সদস্য এম কে আনোয়ার।

বিজয় র‍্যালি:
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে বিজয় র‌্যালি করেছে বিএনপি। প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটিয়ে র‌্যালির আদলে রাজপথে শোডাউন করেছে দলটি।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত:
সম্প্রতি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতারা মনে করছেন, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সাথে খালেদা জিয়ার বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্ববহন করে। কারণ বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে কোনো অংশে কম সমস্যা নয় রোহিঙ্গা সমস্যা। আর তাই খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন, যাতে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে পাশে পাওয়া যায়; বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোকে।

রসিক সিটি করপোরেশন নির্বাচন:
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দাবি করলেও সম্প্রতি ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছে বিএনপি। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে জাতীয় পার্টি (এরাশাদ) লাঙল মনোনীত প্রার্থী। তবে নির্বাচনের দিন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, রসিক নির্বাচন দুইভাবে কারচুপি করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনে ব্যর্থ নির্বাচন কমিশন। যদিও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নাই।

মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ:
চলতি বছরে ২৪ ডিসেম্বর বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, আগামীদিনে যে কর্মসূচি দেওয়া হবে, সেই কর্মসূচি পালনে আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে ক্ষমতায় এবং অনির্বাচিত সংসদ বহাল রেখে দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না।নির্বাচন হবে না।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares