উচ্চশিক্ষায় সর্বাধিক ব্যয় বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে

22 total views, 1 views today

নিউজ ডেক্স:: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গড় ব্যয় বেশি। এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয় সর্বাধিক চার লাখ ৬৯ হাজার ৬০৭ টাকা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ ২৬ হাজার ৭৭৯ টাকা। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় সর্বাধিক এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৮ টাকা ও সর্বনিম্ন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ হাজার ৯৫ টাকা। আর উচ্চশিক্ষা অর্জনে একজন শিক্ষার্থীর এই খরচের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ সরকার অর্থাৎ জনগণের টাকায় বহন করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তি ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি, ক্যাম্পাস সহিংসতা এবং সেশনজটের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে। বিশেষ করে চার বছরের স্নাতক শেষ করতে ছয় বছর ও এক বছরের স্নাতকোত্তর শেষ করতে শিক্ষার্থীদের দুই থেকে আড়াই বছর লাগছে। শিক্ষা জীবন শেষ করতে বাড়তি সময়ের কারণে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। আর গ্র্যাজুয়েটদের সঠিকভাবে কর্মে নিয়োজিত করতে না পারায় মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে।

উচ্চশিক্ষা তদারকি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৬ সালে জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও মাদরাসা ছাড়া দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ জন। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ লাখ এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩০৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের বার্ষিক ব্যয়ের ভিত্তিতে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে দেখা গেছে, ঢাকা, রাজশাহী, বাংলাদেশ কৃষি, বাংলাদেশ প্রকৌশল, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, ইসলামী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উন্মুক্ত, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ঢাকা প্রকৌশল, রাজশাহী প্রকৌশল, চট্টগ্রাম প্রকৌশল, খুলনা প্রকৌশল, জগন্নাথ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা, সিলেট কৃষি, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, বাংলাদেশ টেক্সটাইল, বরিশাল ও রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু গড় ব্যয় বিগত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু গড় ব্যয় গত বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৩ হাজার ৮১টি কলেজে ২৩ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। কমিশন থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো রাজস্ব বরাদ্দ দেয়া হয় না। বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্র, এক হাজার ৪৭৫টি স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে ৬টি স্কুলের ২৭টি আনুষ্ঠানিক ও ১৯টি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচির অধীনে এসএসসি ও এইচএসসি প্রোগ্রামের ১ লাখ ৭৭ হাজার ১০৯ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৪১৩ জন শিক্ষার্থীর ভিত্তিতে শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় এক হাজার ৪৯ টাকা।

ইউজিসি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু যা ব্যয় করা হয় সে তুলনায় জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় অনেক কম, ফলে এই দুটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। অথচ উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশ করেছে দেশের উচ্চশিক্ষা তদারকি প্রতিষ্ঠান ইউজিসি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, কারিগরি শিক্ষার জন্য সরকারকে ব্যাপক পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু দেখা যায়, বুয়েট কিংবা ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে বিসিএস দিয়ে প্রসাশন ক্যাডারে চাকরি করছে। এতে করে আজীবন অর্জিত শিক্ষা কর্মজীবনে কোনো কাজে আসছে না। জাতি বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, মুক্তবাজার নীতিতে অর্জিত শিক্ষা প্রয়োগ করে যেখানে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবে সেখানেই যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হচ্ছে সব ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।

এজন্য দীর্ঘ মেয়াদি নীতি গ্রহণ প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খরচের পরও অর্জিত জ্ঞান দেশ গঠনে সঠিকভাবে প্রয়োগ না করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে জাতি হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

২০১৬ সালে শিক্ষার্থীপ্রতি মাথাপিছু গড় ব্যয় হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ১৩ হাজার ৩৭৬ টাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭ হাজার ৬৬৯ টাকা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ ৩৩ হাজার ৪২৫ টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ২৭ হাজার ৩৭২ টাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯২ হাজার ৩১৩ টাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৯ হাজার টাকা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০ হাজার ৩৪৪ টাকা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ হাজার ৯০২ টাকা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৮ টাকা, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৪৯ টাকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক লাখ ২০ হাজার ৪২৩ টাকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখ ২৬ হাজার ৭৭৯ টাকা।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ বানাতে পারিবারিক খরচের চেয়ে রাষ্ট্র বেশি খরচ করছে। এ অবস্থায় তারা সমাজকে কতটুকু দিচ্ছে তা হিসেব করা প্রয়োজন। নবীন প্রজন্ম বুঝতে পারছে না কার টাকায় তারা লেখাপড়া করেছে। তারা দেশ বা সমাজের উন্নয়ন নয়, নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলন এক কথা নয়। বর্তমানে ছাত্র, শিক্ষক এমনকি পেশাজীবী সব ক্ষেত্রে লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি চলছে।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •