সিন্ডিকেটের কব্জায় পেঁয়াজের বাজার

অর্থনীতি ডেক্স:: সিন্ডিকেটের দখলে পেঁয়াজের বাজার। কখনও দেশি পেঁয়াজের সংকট, আবার কখনও আমদানি করা পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি- এ ধরনের নানা অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়িয়েই চলেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট।

তবে বাস্তবতা পুরোটাই ভিন্ন। দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টনের মতো। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুসারে দেশে বছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় সাড়ে ২১ লাখ টন।

এদিকে বিভিন্ন দেশ থেকে বছরে ৭ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। এ হিসাবে দেশে পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ৭ থেকে ১০ লাখ টন বেশি। তারপরও সরবরাহ সংকট দেখানো হচ্ছে।

আর এ অজুহাতে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চক্র এ কাজ করছে। এটি দেখার দায়িত্ব সরকারের। বাজারের সঠিক মনিটরিং থাকলে এমনটি হওয়া সম্ভব নয়।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজের দাম এখন অস্বাভাবিক। এটা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার একেবারেই বাইরে।

দেখা যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একজন আরেকজনের দোষ দেয়। কিন্তু বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব সরকারের। কোনো ধরনের কারসাজি হলে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে গেলে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়।

তাই ভোক্তার সুরক্ষা দিতে হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দরকার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। কিন্তু দেশে সেটি হচ্ছে না। কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর হাতেই নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণ। এরা কারসাজি করলে সরকারের আর করার কিছু থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকবে। কিন্তু তার মানে এ নয়, এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যা খুশি তা-ই করার সুযোগ পাবে। বিশ্বের অনেক দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকলেও সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও থাকে।

বাংলাদেশেও এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এর জন্য দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মনিটরিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টিসিবির সক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি, তা না হলে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।’

বুধবার সরেজমিন রাজধানীর পেঁয়াজের পাইকারি আড়ত শ্যামবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেশি পেঁয়াজের কোনো ধরনের সংকট দেখা যায়নি। সেখানকার প্রত্যেকটি আড়তে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে দেশি পেঁয়াজের বস্তা।

আমদানি করা পেঁয়াজের সরবরাহও বেশি দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশি পেঁয়াজ পাইকারি দরে প্রতি পাল্লা (৫ কেজি) ৬১০ থেকে ৬২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক্ষেত্রে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম হয় ১২২ থেকে ১২৫ টাকা। আর ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতি পাল্লা (৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ৩৭৫ থেকে ৩৯০ টাকা, যা কেজিপ্রতি দাম হয় ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা। অর্থাৎ তিন দিনের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের পাইকারি দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা।

একই দিন রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার ও মালিবাগ বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশি পেঁয়াজ মানভেদে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা তিন দিন আগে শনিবার বিক্রি হয়েছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা।

আর গত সপ্তাহে এ পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারের খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতা মো. সোনই আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘পাইকারি বাজার থেকে চাহিদা অনুযায়ী পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না।

অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কম দেখিয়ে বেশি মুনাফা করছে। তারা খুচরা বাজারে অল্প পরিমাণে পেঁয়াজ ছাড়ছে।’

দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুল মালিক বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কম, অথচ চাহিদা বেশি। আর দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ এখনও তেমনভাবে বাজারে আসেনি। এ কারণেই দাম বেশি। সপ্তাহখানেক পর বাজারে সরবরাহ বাড়বে। তখন দাম কমবে।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা মো. জসিম যুগান্তরকে বলেন, মনে হচ্ছে পেঁয়াজ আর খাওয়া যাবে না। কারণ যে টাকা দিয়ে পেঁয়াজ কিনব, সে টাকা দিয়ে অন্য খাদ্যপণ্য কেনা যায়। পেঁয়াজ ছাড়া যেহেতু কোনো তরকারি রান্না করা যায় না, তাই ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের মৌসুমেও পণ্যটি নিয়ে কারসাজি করছে।’

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজের সংকট। আবার আমদানি পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এগুলো সব তাদের অজুহাত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তারা নতুন পেঁয়াজ আসার আগে বেশি মুনাফা করার জন্য সিন্ডিকেট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে।’ তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা স্বার্থরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে। আর যে বা যারা অতি মুনাফার লোভে পণ্যের দাম বাড়াবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এভাবেই চলতে থাকবে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক সূত্র জানিয়েছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী দেশে চাহিদার প্রায় কাছাকাছি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। পাশাপাশি আমদানিও করা হচ্ছে ৭ থেকে ১১ লাখ টন।

উৎপাদন ও আমদানির এ তথ্য হিসাবে নিলে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে বাজার স্থিতিশীল থাকার কথা। কিন্তু বাজার স্থিতিশীল থাকছে না। তাহলে কোথাও গোলমাল রয়েছে।

এটা বের করার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয় সে কাজটি করছে। আর পাইকারি ও খুচরা বাজারে যে অস্বাভাবিক দাম রয়েছে, তা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।

কমেন্ট
শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •